ওয়ানস্টপ সার্ভিস দিলে শ্রমিকদের ৪০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারতাম: মাসুদুজ্জামান

ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন দপ্তরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বন্ধ করে ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা হলে শ্রমিকদের ৩০ হাজার নয়, ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া সম্ভব হতো বলে মন্তব্য করেছেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ও মডেল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান মাসুদ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ নগরীর চাঁদমারি এলাকায় চেম্বার ভবনে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও চেম্বারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু।
সভায় মাসুদুজ্জামান সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি, এটা আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু বিরোধী দলের যে ভূমিকা, এনসিপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, সেটাও আমাদের কাছে, ব্যবসায়ীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ, রহস্যজনক এবং হতাশাজনক মনে হয়েছে। কারণ, এই দেশ তো শেষ পর্যন্ত আমাদেরই। আমাদেরই আসলে সমস্যার সমাধান করতে হবে।’
সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনের তিন দিনের অভিজ্ঞতাকে ভিন্ন প্রকৃতির উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার আগেই অপ্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এতে কোনো মালিকের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। মালিক-শ্রমিকের মতামতও নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মাসুদুজ্জামান বলেন, কিছু নেতা শ্রমিকদের জন্য ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি তুলেছেন। তবে এ বিষয়ে মজুরি বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে। সেই সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে প্রায় ৬৭ থেকে ৬৮টি কারখানায় আগের দিনই হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও ইন্ধন রয়েছে বলেও তারা জানতে পেরেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
শ্রমিকদের আন্দোলন প্রতিহত করা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য ছিল না উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত বক্তব্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্যসহ রাজনৈতিক নেতারা পাশে থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতো।
মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড নির্ধারিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীরা কখনো আপত্তি করেননি। এবারও সরকার ও মজুরি বোর্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে, ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের ওপর বিভিন্ন দপ্তরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপের বিষয়টি তুলে ধরে মাসুদুজ্জামান বলেন, আপনাদের পয়সা না দিলে আমরা শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা না, আরও ৪০ হাজার টাকা দিতে পারতাম। আমাদের ওয়ানস্টপ সার্ভিস দেন। শ্রমিকদের কত টাকা বেতন দিতে হয়, আমরা দেব।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন আয়োজন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও জন্মদিন উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের বছরে বিভিন্ন জায়গায় লাখ লাখ, এমনকি কোটি কোটি টাকা দিতে হয়। এভাবে অর্থ ব্যয় করতে করতে মালিকদের অবস্থা এমন হয়েছে যে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এসব অর্থ শ্রমিকদের পেছনে ব্যয় করা গেলে তাদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হতো।
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে আবাসন, রেশনিং ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, মালিকপক্ষ ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মাসুদুজ্জামান। তিনি বলেন, সংগঠন দুটির ব্যাংকে শত শত কোটি টাকা এফডিআর (স্থায়ী আমানত) হিসেবে জমা থাকলেও সংকটের সময় শ্রমিক ও মালিকদের সহযোগিতায় সেই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে না। শ্রমিকদের জন্য ডরমিটরি নির্মাণ, রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রমে এসব অর্থ ব্যয়ের আহ্বান জানান তিনি।
মাসুদুজ্জামান বলেন, শ্রমিক ভালো থাকলে শিল্পও ভালো থাকবে। শ্রমিক সুস্থ থাকলে প্রোডাক্ট অসুস্থ প্রোডাক্ট বের হবে না।
শ্রমিকদের বেতন ২৫ হাজার, ৩০ হাজার নাকি ৩২ হাজার টাকা হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব মজুরি কমিশন ও সরকারের বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সরকারের পাশে থাকবেন বলেও জানান। তবে শ্রমিকদের কল্যাণে মালিক, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

