এসএসসি/৪ পরীক্ষার্থীর জন্য ৯ শিক্ষক, তবু সবাই ফেল

যশোরের শার্শায় চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। উপজেলার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শতভাগ পাসের মুখ দেখেনি। উল্টো তিনটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে ৪ পরীক্ষার্থীর জন্য ৯ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও কেউ পাস করতে পারেনি। মাধ্যমিক ও সমমানের এমন সার্বিক ফলাফলে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মানুষ ও অভিভাবকরা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে। উপজেলায় দাখিল পরীক্ষায় ৩৩টি মাদ্রাসার মধ্যে বারোপোতা সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদ্রাসা ও ঘিবা দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা—এই দুটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। দাখিলে ৮৩৭ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮১২ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৩৪২ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৩ জন। দাখিলে পাসের হার ৪০.৮৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, সাধারণ স্কুল পর্যায়ে পাসের হার ৬৫.৩ শতাংশ হলেও সার্বিক চিত্র বেশ হতাশাজনক। ৩৫টি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাড়াতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অংশ নেওয়া ৪ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। এ ছাড়া একটি বিদ্যালয় থেকে এবার কোনো পরীক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। স্কুল পর্যায়ে উপজেলায় মোট ২ হাজার ৩০০ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ হাজার ২৬১ জন। পাস করেছে ১ হাজার ৫০২ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২৬ জন।
গতকাল মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) শার্শা উপজেলা অতিরিক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সুলতান মাহমুদ ফলাফলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে তুলনামূলক ভালো ফল করে শীর্ষে রয়েছে নাভারন বুরুজ বাগান মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। সেখান থেকে ১২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১০ জন পাস করেছে (পাসের হার ৯০.১৬ শতাংশ) এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ জন। শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বেনাপোল মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা বিদ্যালয় (পাসের হার ৮০.৮৫ শতাংশ), শার্শা সরকারি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৭৬.৮২ শতাংশ), বাগআঁচড়া ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৭৪.৪১ শতাংশ) এবং বাগআঁচড়া সম্মিলিত গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ (৭২.০০ শতাংশ)।
শিক্ষক থাকলেও পাস নেই
উপজেলার যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেলের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে শিক্ষক সংখ্যা পর্যাপ্ত থাকলেও এমন ফলাফলে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। সাড়াতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪ পরীক্ষার্থীর জন্য ৯ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও কেউই পাস করতে পারেনি। অথচ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা এই বিপর্যয়ের জন্য ‘শিক্ষক সংকট’কে দায়ী করেছেন। এ ছাড়া বারোপোতা সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদ্রাসায় ১২ জন শিক্ষকের অধীনে ১৭ জন এবং ঘিবা দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসায় ৯ জন শিক্ষকের পাঠদানে ২৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।
দায় কার
এমন বিপর্যয়ের জন্য শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যবসায় মনোনিবেশ করাকে দায়ী করছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ—শিক্ষকদের সময়মতো বিদ্যালয়ে না আসা, পরিচালনা কমিটিতে দলীয় প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকায় শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
তবে শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না এবং অভিভাবকরাও সন্তানদের পড়ালেখার খোঁজ নেন না। যদিও শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরাতে বা পড়াশোনায় মনোযোগী করতে প্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছিল—তার কোনো সদুত্তর মেলেনি।
শার্শা উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার এ কে এম নুরুজ্জামান বলেন, সম্প্রতি এমপিওভুক্ত হওয়া বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বিগত বছরের তুলনায় অনেক খারাপ ফল করেছে। শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কী কারণে এমন বিপর্যয় ঘটল, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
.png)


