শিক্ষার্থী আজমুল হত্যা/বাবার অভিযোগের মূল ব্যক্তির নাম নেই এজাহারে

খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনকে মারধরের পর চারতলার ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে নিহতের বাবা ঘটনার মূল ব্যক্তি হিসেবে মেসের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও এজাহারে তার নাম নেই।
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানায় মামলাটি করেন আজমুলের বাবা মো. কুতুবউদ্দিন।
আজমুল নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামে। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের ওই মেসে ভাড়া থাকতেন।
রিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এজাহারে বলা হয়েছে, ইসলামনগর রোডের একটি মেসে খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে আজমুলের সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধ হয়। এর আগে মেস থেকে বিভিন্ন জিনিস হারানোর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তোলা হয়েছিল। একপর্যায়ে তাকে মারধর করে চারতলার ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তিনি সেখান থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এজাহারভুক্ত চার আসামি হলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী মো. রবিন ও মো. মুবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের মো. সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের মো. ওবায়দুল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, শুক্রবার রাতে মেসে মিল না দিয়ে খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজনের সঙ্গে আজমুলের বিরোধ হয়। পরে আগের চুরির অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাস্থলে তার মাথার এক পাশের চুল কেটে দেওয়ার চিহ্নও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
নিহতের বাবা মো. কুতুবউদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকাণ্ডের মূল অপরাধী ওই মেসের ম্যানেজার মেহেদী। তার নেতৃত্বেই আমার ছেলেকে মারধর করে চারতলার ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে।’
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার আগে আজমুলকে আটকে রেখে চুরির ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। টাকা চাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা পুলিশ যাচাই করছে।
ঘটনার পর ওই মেসে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থতলার কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ। ওই দুই তলার বাসিন্দাদের কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি।
বাড়িটির তত্ত্বাবধানে থাকা আকিবুর হোসেন বলেন, ঘটনার পর থেকেই ওই দুই তলার বাসিন্দারা সেখানে নেই। বাড়ির মালিক সরোয়ার হোসেন চট্টগ্রামে চাকরি করেন। বর্তমানে বাড়িটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মেহেদী হাসান।
মেসে রান্নার কাজে নিয়োজিত ফাতেমা বেগম বলেন, ঘটনার সূত্রপাত খাবার নিয়ে। এর আগে মেস থেকে বিভিন্ন জিনিস হারানোর অভিযোগ নিয়েও আজমুলের ওপর কয়েকজনের ক্ষোভ ছিল। এসব বিষয় নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু বকর বলেন, শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি বিকট শব্দ শুনতে পান। পরে দরজা খুলে বাড়ির সামনের গলিতে একজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
হরিণটানা থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, আজমুলকে কীভাবে মারধর করা হয়েছে, মারধরের পর তাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল কি না, নাকি অন্য কোনোভাবে তিনি নিচে পড়ে গেছেন—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, মেসের বাসিন্দাদের মধ্যে আগে থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ ছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। অন্যের পোশাক ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল। এখন পর্যন্ত মামলার কোনো এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ওসি।
