logo
Advertisement

ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে নলছিটির ৪ স্কুল, নদীর পেটে খেলার মাঠ

নাঈম হাসান ঈমন,ঝালকাঠি
ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে নলছিটির ৪ স্কুল, নদীর পেটে খেলার মাঠ
ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবন নদীর পাড়ের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। জোয়ারের সময় নদীর পানি মাঠে উঠে আসে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দুই থেকে তিন মাসের ব্যবধানে বিষখালী নদীর ভাঙন ঝালকাঠির নলছিটির চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ থেকে ১৫০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়গুলোর খেলার মাঠের বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে মাঠ ও শ্রেণিকক্ষ। নদীর পাড় ঘেঁষে থাকা জরাজীর্ণ ভবনগুলোতেও দেখা দিয়েছে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা। এমন পরিস্থিতিতে চার বিদ্যালয়ের সাত শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যালয়গুলো হলো—নলছিটি উপজেলার নাচনমহল ইউনিয়নের ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাশের রানাপাশা ইউনিয়নের হদুয়া গ্রামের ইসলামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

১০০ গজের মধ্যে বিষখালী, নদীতে বিলীন মাঠ-বেড়িবাঁধ

সরেজমিনে দেখা যায়, নাচনমহল ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বিষখালী নদীর তীব্র ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একই আঙিনায় থাকা ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত দুই থেকে তিন মাসে নদীভাঙন বিদ্যালয় দুটির প্রায় ১০০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। বিদ্যালয়ের ভবন নদীর পাড়ের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। জোয়ারের সময় নদীর পানি মাঠে উঠে আসে এবং ঢেউ আছড়ে পড়ে ভবনের কাছাকাছি।

দুই বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। নদীভাঙনে ইতোমধ্যে বিদ্যালয় দুটির খেলার মাঠের বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিদ্যালয়ের পাশে থাকা একটি বেড়িবাঁধও গত ১৫ আগস্টের ভাঙনে মাঠের একাংশসহ নদীতে বিলীন হয়েছে। ফলে নদী ও বিদ্যালয়ের মধ্যে এখন কার্যত নিরাপদ দূরত্ব নেই।

জোয়ারে তলিয়ে যায় মাঠ ও শ্রেণিকক্ষ, জরাজীর্ণ ভবনেও ঝুঁকি

ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনমথ রঞ্জন সমাদ্দার বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন বিদ্যালয় ভবনের একেবারে কাছে চলে এসেছে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। জোয়ারের সময় বিদ্যালয়ের মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়। যে হারে ভাঙন এগিয়ে আসছে, তাতে যেকোনো সময় বিদ্যালয় ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিদ্যালয়টি দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন।’

ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘গত তিন মাসে ভাঙন বিদ্যালয়ের ১০০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। গত ১৫ আগস্টের ভাঙনে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের একাংশসহ বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়েছে। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে অবশিষ্ট মাঠটুকুও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন।’

ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে জোয়ারের সময় নদীর পানি মাঠে উঠে আসে এবং ঢেউ আছড়ে পড়ে ভবনের কাছাকাছি। ছবি : এশিয়া পোস্ট
ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে জোয়ারের সময় নদীর পানি মাঠে উঠে আসে এবং ঢেউ আছড়ে পড়ে ভবনের কাছাকাছি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুন্নি আক্তার ও হাসানুজ্জামান বলেন, ‘একসময় আমাদের বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ছিল। নদীভাঙনের কারণে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। বর্তমানে সব শ্রেণি মিলিয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অবশিষ্ট মাঠ ও বিদ্যালয় ভবনও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।’

অন্যদিকে, পাশের রানাপাশা ইউনিয়নের হদুয়া গ্রামে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। জরাজীর্ণ ভবনে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের বসার জায়গা নেই। জোয়ার এলেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়। পাঁচ বছর আগেও বিষখালী নদী বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ গজ দূরে ছিল। কিন্তু গত ছয় মাসের ভাঙনে নদী বিদ্যালয় থেকে মাত্র ১৫০ গজের মধ্যে চলে এসেছে।

ভাঙন ঠেকানো ও নিরাপদ স্থানে বিদ্যালয় সরানোর দাবি

ইসলামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়টি বছরের প্রায় ছয় মাস পানিবন্দি থাকে। জরাজীর্ণ ভবনে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা সব সময় শঙ্কায় থাকি। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে আশঙ্কাজনক হারে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। গত তিন-চার মাসে বিষখালী নদীর ভাঙন বিদ্যালয়ের ১৫০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। দ্রুত উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।’

বছরের প্রায় ছয় মাস পানিবন্দি থাকে ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি : এশিয়া পোস্ট
বছরের প্রায় ছয় মাস পানিবন্দি থাকে ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি : এশিয়া পোস্ট

অভিভাবক শারমিন আক্তার, রুবিনা বেগম ও সালমা আক্তার বলেন, ‘ভাঙনকবলিত বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠিয়ে আমরা প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকি। কখন নদী বিদ্যালয়ের আরও কাছে চলে আসে, কখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে—এই ভয় সব সময় কাজ করে। সরকার দ্রুত বিদ্যালয়গুলো রক্ষা কিংবা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করলে আমরা স্বস্তি পাব।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক শাহিন হাওলাদারসহ কয়েকজন বলেন, বিষখালী নদীর ভাঙনে এরই মধ্যে এলাকার বহু মানুষ ভূমিহীন হয়েছেন। এই বর্ষায় ভাঙন আরও ভয়াবহ হয়েছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবারের বাড়িঘর, কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এখন বিদ্যালয়গুলোও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এগুলো নদীতে বিলীন হয়ে গেলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তারা দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’

মোল্লারহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম বলেন, দুই ইউনিয়নের চারটি বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। দুর্গম এলাকার শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গত দুই বছরে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করায় বিদ্যালয়গুলো নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। বিদ্যালয়গুলো রক্ষায় দ্রুত নদীভাঙন ঠেকাতে হবে। প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে।

নলছিটি উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার বদরুল আমিন বলেন, ভাঙনে বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিদ্যালয়গুলো রক্ষায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, ভাঙনকবলিত ভবানীপুর এলাকা ও বিদ্যালয় দুটি পরিদর্শন করেছেন ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। তিনি স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে ভাঙনের পরিস্থিতি দেখেন।

নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রতীক কুমার কুন্ডু বলেন, ভাঙনকবলিত বিদ্যালয়গুলো আমি এবং ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো পরিদর্শন করেছি। বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা কাজ শুরু করেছি। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করছি, অচিরেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে চারটি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য স্থাপনাও বিষখালী নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষাজীবন। তাই দ্রুত টেকসই নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে বিদ্যালয়গুলো নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।