logo
Advertisement

ভোলা/জরাজীর্ণ ভবনে চলছে ৫৮৮ শিক্ষার্থীর পাঠদান

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,ভোলা
জরাজীর্ণ ভবনে চলছে ৫৮৮ শিক্ষার্থীর পাঠদান
বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টি পায়নি আধুনিক কোনো একাডেমিক ভবন। পুরোনো দোতলা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে চলছে প্রায় ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান।

বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত এই দুরবস্থা দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। ২০০৫ সালে নির্মিত দোতলা ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে পড়েছে। ছাদে দেখা দিয়েছে ফাটল। দরজা-জানালার অবস্থাও নাজুক। অন্যদিকে, টিনশেড শ্রেণিকক্ষের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও বেঞ্চ। বিদ্যালয়ে নেই বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, ছাত্রীদের সাধারণ কক্ষ (কমনরুম) ও সীমানাপ্রাচীর। বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতায় ডুবে যায় বিদ্যালয়ের মাঠ ও প্রবেশপথ। তীব্র গরমে টিনের চালের নিচে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয় অসহনীয় পরিবেশ।

১৯৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ৩৩ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ৫৮৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৫৮৮ শিক্ষার্থীর জন্য বেঞ্চ রয়েছে মাত্র ১১০টি। ফলে একটি বেঞ্চে যেখানে দুই থেকে তিনজন শিক্ষার্থী বসার কথা, সেখানে পাঁচ থেকে ছয়জনকে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ে নেই বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, মানসম্মত লাইব্রেরি, ছাত্রীদের কমনরুম কিংবা প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। এমনকি প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক মিলনায়তন ও অফিস কক্ষের জন্য পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থাও নেই।

বিদ্যালয়ে বর্তমানে মাত্র একটি শৌচাগার রয়েছে, যা ৩২৯ জন ছাত্রী ও নারী শিক্ষককে ব্যবহার করতে হয়। পুরুষ শিক্ষক ও ছাত্রদের শৌচাগারের জন্য আশপাশের বাড়িতে যেতে হয়। শিক্ষকদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্মাণে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও পরে সেই বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায়।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহবুবা আক্তার ফাতেমা বলে, মেয়েদের জন্য মাত্র একটি টয়লেট। সেখানে ঢুকতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সাবান বা হাত ধোয়ার আধুনিক ব্যবস্থাও নেই। কমনরুম না থাকায় ছাত্রীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আবি আব্দুল্লাহ আহাদ বলে, শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফ্যান নেই। প্রচণ্ড গরমে টিনের চালের নিচে দমবন্ধ পরিবেশে ক্লাস করতে হয়। তার ওপর বেঞ্চের সংকট থাকায় গাদাগাদি করে বসতে হয়।

বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। জলাবদ্ধতায় মাঠ ও প্রবেশপথ পানিতে ডুবে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত ও আড্ডার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়।

এদিকে, শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে গ্রুপভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস কখনো প্রধান শিক্ষকের কক্ষে, কখনো লাইব্রেরি, বারান্দা কিংবা অন্য অস্থায়ী স্থানে নিতে হয়। এতে শিক্ষা কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন। বর্তমানে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চারুকলা ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ মোট চারটি পদ শূন্য রয়েছে।

স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, ভোলা সদর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে। কোথাও কোথাও রয়েছে আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব। অথচ তিন দশকের বেশি পুরোনো বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এখনো পুরোনো ভবন ও টিনশেডের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।

বিদ্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় বিদ্যালয়ের দুটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়ে। পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করে সেমিপাকা ঘর করা হয়েছে। তবে মূল একাডেমিক ভবনের সংকট এখনো কাটেনি।

এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির পাসের হার ৫৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন শিক্ষার্থী। আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী।

শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি বিদ্যালয়টি বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সমাবেশ, ক্ষুদে ডাক্তার দল, মাদকবিরোধী কার্যক্রম ও ইভটিজিং প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ. সহিদ তালুকদার বলেন, গত সরকারের আমলে বহুতল ভবনের জন্য চারবার আবেদন করেও কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অথচ আশপাশের অনেক বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। ভবনসংকটের কারণে এখন টিনের ঘরেও ক্লাস নিতে হচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পরিবেশ অনেক উন্নত হবে। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আবদুল কাদের সেলিম বলেন, শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে এখন আর দেরি করার সুযোগ নেই। জরুরি ভিত্তিতে একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ, স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক, বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, এ বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ধর্ম ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব মোশারফ হোসেন শাহজাহান প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ভোলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভবনের নাজুক অবস্থা দেখা গেছে। বহুতল ভবনের জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ছবি ও প্রতিবেদনসহ বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টির উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিষয় :