পাবনায় শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা/মরদেহ লুকিয়ে রেখে খুঁজতে বের হন আসামিরা

পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলোনিয়া গ্রামের ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ বস্তাবন্দি অবস্থায় ডোবায় ফেলে রাখা হয়। পরে ঘটনা আড়াল করতে আসামিরা নিজেরাই শিশুটিকে খুঁজতে বের হন, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলেও অংশ নেন। এমনকি নিখোঁজ কলিকে উদ্ধারের দাবিতে এলাকাবাসীর তল্লাশি কার্যক্রমেও তারা সম্পৃক্ত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পাবনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. আশ্রাফ আলী।
গ্রেপ্তার মোস্তফা কামাল (৫৫) কুলোনিয়া ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আবদুল মতিন প্রামাণিকের ছেলে। অপর আসামি ইয়াছিন আলী (২১) সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সুবর্ণসারা গ্রামের মৃত মোহাব্বত আলীর ছেলে, বর্তমানে তিনি কুলোনিয়া ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করছিলেন।
তাদের দেওয়া তথ্য, মোবাইল ফোনের ডিজিটাল আলামত ও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার বলেন, গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কুলোনিয়া গ্রামের কামাল প্রামাণিকের মেয়ে কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। ওই দিন মোস্তফা কামাল ও ইয়াছিন আলী শিশুটিকে ফুঁসলিয়ে মোস্তফার মুদি দোকানের পেছনের শয়নকক্ষে নিয়ে যান এবং দুজন মিলে তাকে ধর্ষণ করেন। পরে ঘটনা জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন তারা। প্রথমে হলুদ রঙের একটি প্লাস্টিকের বস্তায় শিশুটির মরদেহ ঢুকিয়ে মোস্তফার ঘরের খাটের নিচে রাখা হয়। একদিন পর রাতে মরদেহসহ বস্তাটি আবার সাদা রঙের আরেকটি বস্তার ভেতরে ঢোকানো হয়। পরে দুটি ইট বস্তার সঙ্গে বেঁধে বাড়ির পাশের একটি পরিত্যক্ত ডোবায় ঝোপঝাড় ও লতাপাতার নিচে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়।
ঘটনার পরও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন আসামিরা। কলিকে উদ্ধারের দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেন এবং বাড়ি বাড়ি তল্লাশির উদ্যোগ নেন। সেই তল্লাশিতেও আসামিরা অংশ নেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ সুপারের দাবি, ১৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আসামিরা ডোবা থেকে মরদেহটি তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। বস্তাটি একটি সেপটিক ট্যাঙ্কের কাছে নেওয়ার সময় মরদেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। একই সময় কুকুরের ডাক শুনে ভয় পেয়ে তারা বস্তাটি সেখানে ফেলে পালিয়ে যান। পরদিন সকালে মরদেহ দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন।
তদন্তে মোস্তফা কামালের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে কলি তার ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মোস্তফার মুদি দোকানে যায়। ওই সময় মোস্তফা শিশুটির একাধিক ছবি মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। পরে ছবিগুলো মুছে ফেললেও প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার জানান, ময়নাতদন্তে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলও তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কলি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর কেউ জড়িত আছে কি না, ধর্ষণ ও হত্যার পুরো ঘটনা এবং মরদেহ গুমের পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় বৃহস্পতিবার তদন্তভার পাবনা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগপত্র দাখিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রেস ব্রিফিংকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাখাওয়াত হোসেন, ডিবির ওসি রাশিদুল ইসলাম রাশেদ ও সদর থানার ওসি তরিকুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


