logo
Advertisement

ভোলায় জলাবদ্ধতায় হুমকির মুখে ১৩ হাজার হেক্টর জমির আমন চাষ

এশিয়া পোস্ট নিউজ,ভোলা
ভোলায় জলাবদ্ধতায় হুমকির মুখে ১৩ হাজার হেক্টর জমির আমন চাষ
বিলে হাঁটু পানিতে নেমে আমন ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভোলায় তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে আমন ধানের আবাদ। সদর উপজেলার চর পাঙ্গাশিয়াসহ ২০টি বিলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি জমে থাকায় ৫০ হাজার কৃষকের ১৩ হাজার হেক্টর জমির আমন আবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে এমন দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের।

Advertisement

কৃষি বিভাগ বলছে, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে এই অনাবাদি জমিগুলো আবাদযোগ্য হবে এবং আমনের উৎপাদন বাড়বে।

ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের পাঙ্গাশিয়া গ্রামের কৃষক মহসিন জানান, চলতি বছর তিনি প্রায় ৬০ শতাংশ জমি দুই লাখ টাকা খরচে লিজ নিয়েছেন। স্বপ্ন ছিল, বছরজুড়ে আমনসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে লিজের খরচ তুলে লাভের মুখ দেখবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জমিতে জলাবদ্ধতা থাকায় তার আমন চাষ ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো চারা রোপণ করতে না পেরে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার।

কৃষক মহসিন আক্ষেপ করে বলেন, এই জমিতে আমি বছরে সোয়াবিন, আউশ ও আমন ধান চাষ করি। পাশের জমিতে আমন ধান ইতিমধ্যে হাঁটুসমান হয়ে গেছে, কিন্তু আমরা এখনও রোপণ করতেই পারিনি। সময়মতো রোপণ করতে পারলে ধান এতদিনে কোমর সমান হতো। এখন রোপণ করা নিয়েই চিন্তায় আছি। এই জমি নিয়ে আমাদের আর কোনো আশা-ভরসা নেই। কবে লাগাব আর কবে তা বড় হবে! চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি আমরা, আমাদের খোঁজখবর কেউ নেয় না।

ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের চর পাঙ্গাশিয়া বিলে প্রতিবছরের এ সময়ে কৃষকদের চারা রোপণে ব্যস্ত থাকার কথা। তবে এবার বিলজুড়ে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় জমিতে নামতেই পারছেন না তারা।

এই বিলে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কৃষক চাষাবাদ করেন। অতিরিক্ত পানি জমে থাকায় বিলে প্রায় ৭০৩ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও এবার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কৃষি জমির পাশে গ্যাস প্রসেস প্লান্ট তৈরি করার সময় পানি নিষ্কাশনের ছোট নালাটি ভরাট করে ফেলাতেই পানি আটকে আছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য বারবার আবেদন জানিয়েও কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি।

শুধু চর পাঙ্গাশিয়া বিলই নয়; একই চিত্র দক্ষিণ চরপাতা বিল, সুদুরচর বিল, বাপ্তা ইউনিয়নের চরপোটকা, চরনাপ্তা, দক্ষিণ চরনোয়াবাদ, ভেলুমিয়ার চরগাজী, শরীফখাঁ বাজার, ভেদুরিয়ার মিয়ার চর ও চরকালি বিলেও। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা চর পাঙ্গাশিয়া বিলে।

জলাবদ্ধতার ফলে শুধু কৃষিজমিই নয়; বিলসংলগ্ন অনেক বাড়ির উঠান, রাস্তা, সুপারি বাগান ও পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, পানি চলাচলের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি বিলে ঢুকলেও বের হতে পারছে না। ফলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

চর পাঙ্গাশিয়া বিলের কৃষক মোকাম্মেল জানান, আষাঢ় মাসের শুরুতেই আমরা বীজতলা তৈরি করতাম। কিন্তু জমি বৃষ্টির পানিতে একবুক ভেসে যাওয়ায় সময়মতো চারা রোপণ করতে পারিনি। এখন ভাদ্র মাসও শেষ হয়ে যাচ্ছে। পানির কারণে এবার এই বিলে ফসল হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আমাদের পরপর দুটি মৌসুম নষ্ট হলো, আমরা খুব ক্ষতির মধ্যে আছি। যে দিক দিয়ে পানির লাইন ছিল, সে দিক দিয়ে পানি নামতে না পারায় এমনটা হয়েছে।

বিলের পাশের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম জানান, আগে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে একটা ছোট নালা ছিল, সেটি দিয়ে পাঙ্গাশিয়ার সব পানি নেমে যেত। এখন এখানে গ্যাস ফিল্ডের প্রসেস প্লান্ট তৈরি করায় সেই নালা ভরাট করে ফেলা হয়েছে, তাই পানি নামতে পারছে না। বর্ষাকালে আমাদের ঘরবাড়ি ডুবে থাকে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে পানির মধ্যে থাকতে খুব কষ্ট হয়। এখন যদি পানি নামার নালাটি পুনরায় চালু করে দেওয়া হয়, তবে এ এলাকার কৃষকসহ সবার উপকার হতো।

এদিকে ভুক্তভোগী কৃষকেরা পানি নিষ্কাশনের দাবিতে একাধিকবার প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে আবেদন জানিয়ে এবং মানববন্ধন করেও কোনো সুফল পাননি।

কৃষি বিভাগ জানায়, অপরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট, বসতবাড়ি ও রাস্তা নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা ও পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাপেক্সের গ্যাস ফিল্ড প্রসেস প্লান্টের সার্ভেয়ার মেহেদী হাসান মির্জা জানান, আমাদের এই প্লান্টের পাশ দিয়ে ইতিমধ্যে একটি ড্রেন করে দেওয়া হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এটি আরও বড় করে ড্রেন নির্মাণ করার পরিকল্পনা বাপেক্সের রয়েছে।

ভোলা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. কামরুল হাসান জানান, ভোলা সদর উপজেলার বড় বড় বিলের জমি অপরিকল্পিতভাবে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষাকালে জমে থাকা পানি নামতে পারছে না। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আমন চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমন চাষাবাদ কিছুটা বিলম্বিত হওয়ায় ফলনে ঘাটতি হতে পারে। শুধু খাল খনন করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করা, পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করা এবং প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সজল চন্দ্র শীল জানান, কৃষি জমিতে বা তার আশপাশে অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণের কারণেই মূলত এমনটা হচ্ছে। এতে কৃষকদের চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা এই সংক্রান্ত অনেকগুলো অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি বিভাগ, বিএডিসি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

জলাবদ্ধতার কারণে ভোলা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার কৃষকের ১৩ হাজার হেক্টর জমির আমন আবাদ এখন হুমকির মুখে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কৃষকরা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ছেন। দ্রুত এই জলাবদ্ধতার সমাধান না হলে এবার আমন চাষ বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে চর পাঙ্গাশিয়া বিলসহ উপজেলার হাজারও কৃষক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

বিষয় :