‘থানায় গিয়ে দেখি চালক ছেলের চাচা আগেই উকিল নিয়ে বসেছিল’

‘একটি প্রাইভেটকার চাপা দেয় ফুটপাতে বসে থাকা এক যুবককে। দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের আসন থেকে বের হয় এক কিশোর, পাশের সিট থেকে বের হন আরেকজন ব্যক্তি।’ ঢাকার বারিধারায় নিহত নির্মাণ শ্রমিক মেহেদী হাসান মিমের (২৪) দুর্ঘটনার এই দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অথচ এ ঘটনায় পাশের সিটে বসা আকাশ মারককে আসামি করে মামলা করেন নিহতের বড় ভাই মোক্তাদির ইসলাম।
আসামির নাম পরিবর্তন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন উঠেছে, চালকের পরিচয় সামনে আসার পরও এজাহারে অন্যজনের নাম এলো কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট।
মামলার সময় উপস্থিত ছিলেন নিহতের বোন জামাই মুজিবর রহমানও। তার দাবি, ঘটনার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি কিশোর চালকের চাচাকে একজন আইনজীবীসহ আগে থেকেই সেখানে দেখতে পান। তার ভাষ্য, লাশের সঙ্গে থানায় যাওয়া নিহতের মামা ও ভাই পুলিশি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না। তারা শুধু গাড়ি চালানো ব্যক্তির বিচার চেয়েছিলেন। তখন পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ চালকের নাম বা পাশের সিটে থাকা ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানত না বলেও দাবি করেন তিনি।
মুজিবর রহমান বলেন, আমি থানায় রাত ৯টার দিকে যাই। আমি যতটুকু দেখেছি সেখানে চালক ছেলের চাচা আগে থেকেই উকিল নিয়ে এসে বসেছিল। লাশের সঙ্গে সেখানে আমার মামারা ছিল। তারাও থানায় যান ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। আমরা যারা ছিলাম এত কিছু তো বুঝি না। যদি লাশ থানায় নিয়ে না যাইতো তাহলে আমরা সরাসরি নিয়ে চলে আসতাম। আমরা এই থানা-পুলিশের বিষয়ে কিছু জানি বা বুঝি না।
তিনি আরও বলেন, আমি সেখানে গিয়ে মামাদের সঙ্গে ও মেহেদীর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জেনেছি ওনারা বলেছিল আমরা নাম-ঠিকানা কিছুই জানি না। আমরা শুধু বলেছি, গাড়ি যে চালিয়েছিল তার বিচার চাই। কে গাড়ি চালিয়েছে বা কে পাশের ছিটে বসে ছিল সেটা তো আমরা জানতাম না। আমি যতটুকু বুঝতেছি ছেলের চাচা যিনি উকিল নিয়ে আসছিল হয়তো তারাই পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে নাম পরিবর্তন করেছে।
মুজিবর বলেন, ভাই আমরা গ্রামের সহজ-সরল মানুষ, সকলে কাজ করে খাই। লাশের সঙ্গে যে মামা এবং ভাই গেছিল তারাও কাজ করার জন্য ঢাকায় গেছিল। এখন মামলার বাদী মেহেদীর বড় ভাই উনি তো ঠিকমতো মোবাইলে কথাও বলতে পারে না। তাহলে উনি কীভাবে ওই মানুষগুলার নাম জানবে বা বলবে। বিভিন্ন সাংবাদিক ফোন দিয়ে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করতেছে। অনেকে বিভিন্ন রকম হুমকিও দিতেছে। এজন্য উনি ভয়ে ফোন বন্ধ করে রাখছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, ধনীর দুলালকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। যে পুলিশ মামলাটা লিখেছে সে স্পটে দায়িত্বথাকা পুলিশকে কি ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারতো না, যে গাড়ি কে চালাচ্ছিল? যেহেতু সেখানে সিসি টিভি ফুটেজ সারা দেশ দেখেছে। তাহলে তারা কেন দেখেনি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে যারা সেখানে ছিল থানা-পুলিশের ব্যাপারে তারা ভালো জানে না। ভাইয়ার কাছ থেকে জানতে পারি যে উনি শুধু বলেছিল যে গাড়ি চালিয়েছে আমরা তার বিচার চাই। এখন এখানে ড্রাইভারকে লাইসেন্স কার এটা তো আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি, যে গাড়ি চালিয়ে আমার নিরীহ ভাইকে হত্যা করেছে তার উপযুক্ত শাস্তি হাওয়া চাই। সবাই স্পষ্ট দেখেছে কে গাড়ি চালিয়েছে আর কে সাইডে বসে ছিল।
মামলার এজহারে উল্লেখ রয়েছে, নীলফামারীর ডোমার উপজেলার হাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা এরশাদ আলীর ছোট ছেলে মেহেদী হাসান মিম (২৪) ঢাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করত। বারিধারার এক নম্বর সড়কে ১৩ নম্বর বাড়ির সামনে ফুটপাতে বসে থাকা অবস্থায় মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় তাকে চাপা দেয় এ ঢাকা মেট্রো গ ১৮৬৬৭৬ নম্বরের ব্যক্তিগত গাড়ি। গুরুতর আহত অবস্থায় মেহেদীকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। আকাশ মারক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে নির্মাণশ্রমিক মেহেদীকে চাপা দেওয়ায় তার মৃত্যু হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করেন মামলার বাদী নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদির।
এ দিকে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, কালো রঙের একটি প্রাইভেটকার দ্রুত গতিতে এসে ফুটপাতে বিশ্রামরত মেহেদী হাসানকে চাপা দেয়। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গাড়ির নিচ থেকে মেহেদীর রক্তাক্ত দেহ বের করে আনেন। ফুটপাতে বসে থাকা মেহেদীকে চাপা দেওয়ার পর প্রাইভেটকারটি থেকে দুজন ব্যক্তি নেমে আসেন। গাড়ির ডান পাশ থেকে অর্থাৎ চালকের আসন থেকে নেমে আসে কালো টি–শার্ট পরা এক কিশোর। অপর পাশ থেকে শার্ট পরা মধ্যবয়সী এক ব্যক্তিকে নেমে আসতে দেখা যায়। আশপাশের লোকজন ছুটে এলে তারা দুজনই প্রাইভেটকারের পাশে যান। পরে ওই কিশোরকে সেখান থেকে এক দিকে সরে যেতে দেখা যায়।
এর আগে গুলশান থানার ওসি তদন্ত ইসমাইল হোসেন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, গাড়িচাপায় শ্রমিক নিহতের ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদির বাদী হয়ে গাড়িতে থাকা আকাশ মারক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। কিন্তু গাড়ির ভেতরে থাকায় আজান শরীফ নামে এক কিশোরকেও আমরা হেফাজতে নিয়েছি। আগামীকাল তাকেও আদালতে সোপর্দ করা হবে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চালক কিশোর আজান শরীফকে (১৭) গাজীপুরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় ঢাকার নারী শিশু ট্রাইবুনাল ৮ হাজির করা হলে বিচারক তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

