Advertisement

ভারতীয় নাগরিকত্বের তথ্য মিলেছে, তবুও স্কুলে বহাল প্রধান শিক্ষক

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ভারতীয় নাগরিকত্বের তথ্য মিলেছে, তবুও স্কুলে বহাল প্রধান শিক্ষক
দীপক চন্দ্র সরকার। ছবি: সংগৃহীত

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় নাগরিকত্ব ও ভোটার হওয়ার অভিযোগের তদন্তে তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

Advertisement

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসনের দপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় তার নাম থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) তাকে শোকজও করেছে। তবে অভিযোগ ওঠার এক মাসের বেশি সময় পরও তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গত ২৯ জুন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হয়েও খুলনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে তৎপরতা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে আলোচনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, দীপক চন্দ্র সরকার একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকত্বের সুবিধা নিয়ে আসছেন। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে পাইকগাছার ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকা পর্যালোচনা করে দীপক চন্দ্র সরকারের পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়। ফলে একজন বিদেশি নাগরিকের এমপিওভুক্ত পদে থাকা বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ।

এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা বিষয়টি গুরুতর ও স্পর্শকাতর উল্লেখ করে মাউশির মহাপরিচালকের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবেদন পাঠান।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স কর্মকর্তা মো. ঈমান উদ্দিন ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দেন। পরে ইউএনওর নির্দেশে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি আরেকটি প্রতিবেদন দেয়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমানও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেন।

অভিযোগের মধ্যে ছিল বিদ্যালয়ে কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন এবং অনুদানের অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম। তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ১২ জুলাই বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া পদে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের মধ্যে একজন প্রধান শিক্ষকের ভাইপো এবং অন্য একজন তার শালিকা। এ নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন পর্যায়ে অসংগতি উঠে এলেও অভিযোগের সবকটি বিষয়ে একই ধরনের সিদ্ধান্ত পাওয়া গেছে—এমনটি নথি থেকে স্পষ্ট নয়।

নিয়োগের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই প্রতিবাদ কর্মসূচি, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেন। পরে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন লিখিতভাবে জানান, ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত তারা কোনো নিয়োগপত্র পাননি এবং কর্মস্থলেও যোগ দেননি।

বিদ্যালয়ের ২০২২–২৩ অর্থবছরের প্রণোদনা অনুদানের পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় নিয়েও অভিযোগ ওঠে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষক, সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা যথাযথভাবে ব্যয় করা হলেও অবশিষ্ট অর্থের ব্যয়ের বিল-ভাউচার যথাযথ নয়।

মাউশির উপপরিচালক (বেসরকারি মাধ্যমিক-১) মো. জাকির হোসেন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে দীপক চন্দ্র সরকারকে ১০ কার্যদিবসের সময় দিয়ে শোকজ করা হয়েছিল। তিনি প্রথম নোটিশের জবাব দেননি। পরে দ্বিতীয় দফায় নোটিশ দেওয়া হলে তিনি লিখিত জবাব দিয়েছেন।

দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, সব প্রতিবেদন মহাপরিচালকের দপ্তরে উপস্থাপন করা হবে। এরপর মহাপরিচালক বিষয়টি পর্যালোচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।

তবে ভারতীয় নাগরিকত্ব বা ভোটার হওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার।

তিনি বলেন, আমি এ দেশের নাগরিক। আমি নিজে ভারতে ভোটার হইনি। কেউ আমাকে ফাঁসানোর জন্য ভারতের ভোটার তালিকায় আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে।

বিদ্যালয়ের অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

বিষয় :