পানির ওপরে চাষ করে বছরে ১০ কোটি টাকার লেনদেন, ভাগ্য বদলেছে পিরোজপুরবাসীর

পানির ওপর কচুরিপানা জমিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা ‘ধাপ’ বা ভাসমান বেডে উৎপাদিত হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের সবজি ও চারা। এই চাষাবাদ বদলে দিচ্ছে পিরোজপুরের নাজিরপুরের একদল নারী-পুরুষ কৃষকের জীবন। নাজিরপুর ও পার্শ্ববর্তী নেছারাবাদ উপজেলার শত শত একর জলাভূমিতে এখন সবুজের সমারোহ। ঐতিহ্যবাহী এই ভাসমান সবজি ও চারা চাষকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এ কৃষিকে ঘিরে পুরুষের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদেরও জীবিকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর এই কৃষিপদ্ধতি ইতিমধ্যে জাতিসংঘের একটি সংস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ভাসমান কৃষি ও সবজির চারা উৎপাদনকেন্দ্র এই এলাকা। পিরোজপুর শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন মুগারঝোর গ্রামে এই কৃষি কার্যক্রম গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ও মালীখালী এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামও ভাসমান কৃষির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বর্ষার শুরুতে খাল ও বিলে জমে থাকা কচুরিপানা একত্র করে পচানো হয়। পরে কয়েক স্তরে এসব উপকরণ জমাট বেঁধে তৈরি করা হয় ২ থেকে ৩ ফুট পুরু এবং ৫০ থেকে ১০০ ফুট লম্বা ভাসমান বেড বা ‘ধাপ’। এসব ধাপে মূলত শসা, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, করলা, টমেটো, চালকুমড়া ও বেগুনের বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হয়। এ ছাড়া ধাপে সরাসরি লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক ও পুঁইশাকও চাষ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে ভাসমান বেডে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় হয়। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই মৌসুমে এখান থেকে বিপুল পরিমাণ সবজির চারা ও তাজা সবজি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সরবরাহ করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে কৃষকেরা এখানে চারা কিনতে আসেন। বর্তমানে এই পেশার সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কৃষক সরাসরি জড়িত।
ভাসমান কৃষির এই বিপ্লবের নেপথ্যে প্রাথমিক কাজের বড় একটি অংশ সামলান গ্রামের নারীরা। পুরুষেরা যখন জলাশয়ে ধাপ তৈরি ও যাতায়াতের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন নারীদের কেউ লতা সংগ্রহ করেন, কেউ ‘ম্যাদা’ তৈরি করেন, আবার কেউ তাতে বীজ বপন ও অঙ্কুরিত চারার পরিচর্যা করেন। বাড়ির আশপাশে কিংবা জলাভূমির কাছে বসেই চলে তাদের কাজ। ভাসমান কৃষির এই প্রক্রিয়ায় নারীদের শ্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁদের অনেকের আয় সীমিত।
এ ছাড়া কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা, টেপপানা, গুঁড়িপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে খড়কুটো দিয়ে ছোট ছোট গোলাকার ‘বিড়া’ বা দোলনা তৈরি করেন নারীরা। এর ভেতরে মাটি ও পচা পাতা দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদ্গম ঘটানো হয়। পরে বীজ থেকে চারা গজালে সেগুলো যত্নে বড় করে তোলা, পোকামাকড় দমন এবং ধাপে বসানোর উপযোগী করার দায়িত্ব পালন করেন পরিবারের নারী ও কিশোরীরা।
পিরোজপুরের স্থানীয় কৃষকদের এই ভাসমান চাষাবাদের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। শত বছরের এই অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী শক্তি এখন আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করে পানির ওপর ফসল ফলানোর এই কৃষিপদ্ধতিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৫ সালে ‘গ্লোবাল ইম্পর্ট্যান্ট অ্যাগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম’ (জিআইএএইচএস) বা বিশ্বগুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্যব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নাজিরপুর ও নেছারাবাদের এই পদ্ধতি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও অনুকরণীয় মডেল।
এদিকে ভাসমান কৃষির প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা হাট। ভোরের আলো ফুটতেই নদীতে সারি সারি নৌকায় শুরু হয় বেচাকেনা। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিক্রেতারা নৌকায় করে জলজ উদ্ভিদ নিয়ে আসেন। এসব উপকরণ কিনতে এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় ঘুরে বেড়ান কৃষকেরা। শনিবার ও মঙ্গলবার বসা এই হাটের বেচাকেনার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম।
হাটে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা আলী হোসেন বলেন, মোল্লারহাট থেকে শ্যাওলা নিয়ে আসি। কুড়ি হিসেবে ১৬০ থেকে ৩২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করি। বেচাকেনা মোটামুটি। ভালো দিনে আট-নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, বাজার খারাপ গেলে একটু কম হয়।
শ্যাওলা কিনতে আসা ইয়াসিন খান বলেন, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের জন্য শ্যাওলা কিনতে বাজারে এসেছি। এই শ্যাওলা দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদন করব।
দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের মুগারঝোর গ্রামের বাসিন্দা চাষি জাকারিয়া জানান, গত সাত-আট বছর ধরে তিনি ভাসমান বেড তৈরি ও সবজির চারা উৎপাদনের কাজ করছেন। নিজের কাজের পাশাপাশি গ্রামের অসচ্ছল ও কর্মহীন মানুষদেরও এ কাজে যুক্ত করেছেন। বর্তমানে তাঁর উদ্যোগে অনেকে কাজ করছেন।
এই চাষি আরও বলেন, অনেক পরিবার দুঃখ-কষ্টে আছে। আমি তাদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই, কিন্তু পারা যাচ্ছে না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে এগোনো যেত, আরও মানুষকে কাজে লাগানো যেত।
পার্শ্ববর্তী বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক আছিয়া খাতুন বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করি। সারাদিন পরিশ্রম করেও মাত্র ২০০ টাকা পাই। এতে খুব কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নেই, তাই এগুলোই করি। আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে ভালো হতো। এক হাজার ম্যাদা বানিয়ে দেড়শ টাকা পাওয়া যায়, এতে কি আর সংসার চলে!
পিরোজপুরের জিয়ানগর বাজারে সবজির চারা খুচরা বিক্রি করেন আমজেদ হোসেন। তিনি বলেন, নাজিরপুরের ভাসমান বেডের চারা এনে এখানে বিক্রি করি। এসব চারা ভাসমান বেড থেকে প্রতি পিস পাঁচ থেকে সাত টাকা করে কিনে আনি। পরে বাজারের দিন বিভিন্ন জাতের সবজির চারা ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি করি।
জাত, আকার, চাহিদা ও বাজারের ওপর নির্ভর করে চারার দাম কমবেশি হয়। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের পার্থক্য থেকে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মেটানোর পর ব্যবসায়ীদের আয় হয়। ফলে চারা উৎপাদনকারী কৃষক, পাইকার, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও খুচরা বিক্রেতাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
তবে ভাসমান কৃষিকে আরও লাভজনক করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাদের মতে, দূরদূরান্তে চারা ও পচনশীল সবজি পরিবহনের জন্য দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা ও সংরক্ষণসুবিধা জোরদার করা প্রয়োজন। মৌসুমে মূলধনের সংকট কাটাতে সহজ শর্তে স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত কৃষিঋণের ব্যবস্থাও জরুরি। পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে এই পেশার সঙ্গে জড়িত কৃষকদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।



