সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবছে বন্দরনগরী, ‘গচ্চা’ ৮ হাজার কোটি টাকা

‘১০ মিনিটের মধ্যে বুকসমান পানি হয়ে গেল দোকানে। কিছুই বের করতে পারিনি। আমি আজ পথে বসে গেলাম।’ এভাবে বিলাপ করছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের ‘আয়াত সার্জিক্যাল’-এর মালিক তানভির আহমেদ। দুদিনে দুই দফায় বৃষ্টির পানি ঢুকে তার ওষুধের দোকানের প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তানভির আহমেদের এই হাহাকার আজ চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৩৩ দশমিক ৬ মিলিমিটার, যা আগের দিনের ৫৭ মিলিমিটারের প্রায় অর্ধেক। অথচ এই সামান্য বৃষ্টিতেই বন্দরনগরীর প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ ও জামালখানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল কোথায়?
২০১৭ সালে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা দিয়ে শুরু হওয়া চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মেগা প্রকল্পের ব্যয় বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সিডিএর দাবি অনুযায়ী ইতোমধ্যে ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। ১৬৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল এবং ১১৫টি সেতু-কালভার্ট নির্মাণের পরও সামান্য বৃষ্টিতে কেন শহর ডুবছে—সেই প্রশ্ন এখন জনমনে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী এ প্রসঙ্গে চরম হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এক দশক আগে ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা হতো। এখন ১০০ মিলিমিটারের কম বৃষ্টিতেও শহর ডুবে যাচ্ছে। জবাবদিহি না থাকলে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল জনগণ কোনো দিনই পাবে না।
দায় কার: সিডিএ না সিটি করপোরেশন?
জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে হিজড়া খাল ও জামালখান খালে সংস্কারকাজের জন্য দেওয়া অস্থায়ী বাঁধকে দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ। আজ বুধবার বিকেলে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তড়িঘড়ি করে বাঁধ কাটার নির্দেশ দেন। তবে বর্ষা মৌসুমের প্রাক্কালে কেন পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে সংস্কারকাজ চালানো হলো, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, লক্ষ্য ছিল কিছু কাজ গুছিয়ে তারপর বাঁধ কাটব। কিন্তু হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হওয়ায় আমরা আজ থেকে বাঁধ কেটে দিচ্ছি এবং সংস্কারকাজ আপাতত বন্ধ রাখছি।
প্রকল্পের পাঁচ শতাংশ কাজ বাকি থাকতেই যদি নগরীর এই দশা হয়, তবে বাকি কাজ শেষ হলেও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে কি না—সেই সংশয় কাটছে না। কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের বাস্তবায়ন কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সাধারণ মানুষ এর প্রকৃত সুফল পাবে, তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্ভোগের নতুন চিত্র: ১০০ টাকার ভাড়া ৩০০
নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার চিকিৎসক ডা. ইমরান চৌধুরী বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে দুদিন ধরে তার চেম্বার ও হাসপাতাল বন্ধ। বাসা থেকে অফিস পর্যন্ত তিনটি পয়েন্টে কোমরসমান পানি। বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে আড়াই ঘণ্টা। ১০০ টাকার রিকশা ভাড়া গুনতে হয়েছে ৩০০ টাকা।
একই দশা প্রবর্তক মোড়ের অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরও। অরিন্দম ফার্মেসির ফ্রিজ নষ্ট হয়ে দুই লাখ টাকার জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এখন আবর্জনা। এস্পেরিয়া হেলথ কেয়ারের জেনারেটর বিকল হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে রোগ নির্ণয় সেবা।