ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে ‘জোরপূর্বক’ গর্ভপাত, সালিশেও জরিমানা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ভাটিয়ারী গ্রামে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় বেরিয়ে আসছে একের পর এক নির্মম ও অমানবিক তথ্য। ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী কিশোরীকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করা হয়েছে। এমনকি শালিসে ভুক্তভোগীর বাবাকে জরিমানাও করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গত সোমবার (১৮ মে) ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় চারজনকে আসামি করে মামলা করেন।
মামলার আসামিরা হলেন মাহাবুবুল আলম, ফয়জুল হক, রিপন ও চান মিয়া ওরফে চান্দু মিয়া। এদের মধ্যে দুই নম্বর আসামি ফয়জুল হক যুবদলের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক।
এদিকে মামলার পর মঙ্গলবার (১৯ মে) এজাহারনামীয় তিন নম্বর আসামি রিপনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, রিপনকে আটকের পর থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক চেষ্টা চালিয়ে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।
ফুসলিয়ে ধর্ষণ ও জোর করে গর্ভপাত
ভুক্তভোগী কিশোরীর মা জানান, তাদের নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি নেই। পাহাড়ের কৃষি কাজ এবং স্বামীর পান-চায়ের দোকানের আয়ে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে তাদের সংসার চলে। তার ১৫ বছর বয়সি মেয়েটি বাড়ির পাশে সিডিএ আবাসিক এলাকার খালি মাঠে গরু দেখাশোনা করত। গত বছরের নভেম্বর মাসের দিকে স্থানীয় ৬৫ বছর বয়সি বৃদ্ধ মাহাবুবুল আলম তাকে ফুসলিয়ে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এতে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর গত ৮ মে ধর্ষণকারীর অনুসারী কিছু যুবক পরিবারটিকে হুমকি দিয়ে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং জোরপূর্বক ৭ মাসের গর্ভস্থ সন্তানটি নষ্ট করায়।
এদিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয়ভাবে বসেছিল এক সালিশি বৈঠক। সেখানে অপরাধী এবং ভুক্তভোগী কিশোরীর অসহায় বাবাকে ৫০ হাজার টাকা করে সমপরিমাণ জরিমানা করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাসেম ও কিশোরীর মা জানান, নবনির্মিত যুবদল কার্যালয়ে এই সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সালিশে অপরাধী মাহাবুবুল আলমকে জরিমানার টাকা পরিশোধের জন্য ১০ মে পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও সে তা দেয়নি। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের চেষ্টা চালানো হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার (২০ মে) আসামিরা কিশোরীর বাবাকে জিম্মি করে মামলা প্রত্যাহারের জন্য আদালতে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একদিকে মামলা তুলে না নিলে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে কিশোরীকে বিয়ে দিয়ে ‘প্রতিষ্ঠিত’ করার প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে।
অভিযুক্ত যুবদল নেতার দাবি
সালিসি বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে যুবদল নেতা ফয়জুল হক বলেন, আমাকে কেন মামলার আসামি করা হয়েছে তা আমি জানি না। তবে সালিশটি দলীয় কার্যালয়ে হয়নি, ধর্ষিতার বাড়ির সামনের রাস্তায় হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, সালিশের রায় মেনে নিতে উত্তেজিত কিছু জনতা ভুক্তভোগীর বাড়ি-দোকান ভাঙার চেষ্টা করলে তারা প্রতিরোধ করেন।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং এজাহারনামীয় আসামি রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সামাজিক সালিশে ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। যারা এই প্রহসনের বিচার করেছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।


