
দিনে শহরের বিভিন্ন স্থানে গণহারে যানবাহন আটক ও মামলা, আর রাতে ট্রাফিক অফিসে বসে টাকার বিনিময়ে রফা। সিরাজগঞ্জে ট্রাফিক অফিসের বিরুদ্ধে এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ট্রাফিক বিভাগের চরম অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতায় জেলাজুড়ে তীব্র যানজট ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। মূলত চাঁদাবাজির ভিডিও ফাঁসের অজুহাতে মহাসড়কে ডিউটি করছে না ট্রাফিক পুলিশ। অন্যদিকে শহরে যানবাহন আটক করে চলছে মামলা বাণিজ্য।
তথ্যমতে, যমুনা সেতু পশ্চিম পাড় থেকে নলকা পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশের এরিয়া। এর মধ্যে সেতু পশ্চিম পাড় গোলচত্বর, সায়দাবাদ, চেকপোস্ট, কড্ডার মোড়, ঝাউল ওভারব্রিজ ও নলকা এলাকার মহাসড়ক পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশের ডিউটি করার কথা থাকলেও তারা এখন ডিউটি করছে না। গত তিন মাস আগে যমুনা সেতু পশ্চিম পাড় মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট এরশাদ যানবাহন থামিয়ে টাকা নেওয়ার একটি ভিডিও এশিয়া পোস্টসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। এরপর থেকে মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন না করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে দূরপাল্লার যানবাহনগুলো।
এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ শহরের কাজিপুর মোড়, শহীদ মহকুমা শামসুদ্দীন গেট (পারভীন মোড়), বাজার স্টেশন, রেলগেট, নাজমুল চত্বর, এস এস রোডসহ বিভিন্ন মোড়ে ডিউটি পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশ। তবে দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে যানবাহন আটক করে মামলা দিয়ে রাতে ট্রাফিক অফিসে টাকার বিনিময়ে রফার অভিযোগ উঠেছে।
টানা কয়েক দিন ট্রাফিক অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সারা দিন শহরের বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে মামলা দেওয়া হয়। সন্ধ্যার পর সেসব মামলা ভাঙাতে ট্রাফিক অফিসে এলে শুরু হয় টাকা লেনদেন। মামলায় কোনো যানবাহনে ১৫ হাজার আবার কোনো যানবাহনে ২০-২৫ হাজার টাকা জরিমানা ধরা হয়। এখানে পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করলে কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। তবে পুলিশ সুপারকে ছাড়াই ট্রাফিক অফিস নিজেরা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমিয়ে বাকি টাকা জমা নিয়ে আটক গাড়িগুলো ছেড়ে দেয়।
ট্রাফিক অফিসে কথা হয় হৃদয়, জিহাদসহ কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরের চায়না বাঁধ এলাকা থেকে তাদের মোটরসাইকেল আটক করা হয়েছে কয়েকটি মামলা দিয়ে। সন্ধ্যার পর থেকে তারা ট্রাফিক অফিসে এসে বসে রয়েছেন। কিন্তু বড় স্যার (পরিদর্শক টিআই মোফাকখারুল ইসলাম) না আসায় তাদের কোনো কাজই হচ্ছে না। তারা জানেন না তিনি কখন আসবেন। এরপর রাত ৯টার দিকে টিআই মোফাকখারুল ইসলাম অফিসে এলে শুরু হয় টাকা লেনদেন। আটককৃত বিভিন্ন যানবাহন মালিকদের অনুরোধে কারও ৪০ শতাংশ আবার কারও ৫০ শতাংশ কমিয়ে বাকি জরিমানার টাকা জমা দিতে বলা হয়।
নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, আমাদের জরিমানার টাকা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে এটা ভালো, কিন্তু ২০ হাজার টাকার জায়গায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা কমিয়ে বাকি টাকা জমা দিতে হয়েছে। তারা (ট্রাফিক অফিস) এখান থেকে কত টাকা সরকারি খাতায় জমা দেবে, এটা নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক (টিআই) মোফাকখারুল ইসলাম বলেন, সার্জেন্ট এরশাদের ওই ঘটনার পর থেকে স্যারদের নির্দেশে প্রায় আড়াই মাস ধরে আমরা মহাসড়কে ডিউটি করছি না। পরবর্তী নির্দেশনা পেলে কাজ শুরু করব।
সারা দিন অফিসে না এসে রাতে আসার প্রশ্নে মোফাকখারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি একজন অসুস্থ মানুষ, তবে সারা দিন অফিসে যাই না এটা ভুল, সকালের দিকে অফিসে বসি।’ জরিমানা কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, যানবাহনগুলোর জরিমানার টাকা একমাত্র এসপি স্যার কমিয়ে দিতে পারবেন। আমরা কেউ কিছুই করতে পারব না।
পুলিশ সুপারের উপস্থিতি ছাড়াই জরিমানা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছেন এবং বাকি টাকা জমা দিতে বলেছেন—এমন প্রশ্নে মোফাকখারুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই আমি এখন ব্যস্ত আছি, আপনার সাথে পরে কথা বলব’ বলে লাইন কেটে দেন। এরপর কয়েকবার ট্রাফিক অফিসে গিয়েও তার দেখা পাওয়া যায়নি।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশ ডিউটি করছে না, এটা না। আগে যে স্থানগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ ডিউটি করত, এখন সেটা পরিবর্তন করে অন্য স্থানে দেওয়া হয়েছে।
যমুনা সেতু পশ্চিম পাড়ে যানবাহন থামিয়ে টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে যদি মামলা দিতে যায়, তাহলে দেখা যায় কেউ না কেউ সেটার ছবি তুলে বলে পুলিশ টাকা নিচ্ছে, সে জন্য এখানে বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশ ডিউটি করছে না।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, মামলাকৃত যানবাহনগুলোর টাকা কমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা শুধু আমারই আছে, সেটা অনেক সময় মানবিক কারণেই কমিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আমার অবর্তমানে কেউ এটা পারবে না। যদি এ রকম হয়ে থাকে, তাহলে আমাকে কাগজসহ দেবেন, আমি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।


