সিলেটে তীব্র গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং

সিলেটে প্রচণ্ড গরমের মাঝে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার দিনে একদিকে বাইরে বের হওয়া যেমন দায়, অন্যদিকে বিদ্যুৎহীন ঘরেও মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। চরম এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুঁসছে সিলেটবাসী।
সিলেটে গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) থেকে শুরু হয়েছে তীব্র দাবদাহ। সোমবার তাপমাত্রা ছিল ৩৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মঙ্গলবার আরও বেড়ে পৌঁছেছে ৩৬ ডিগ্রিতে।
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে গত রোববার (৯ আগস্ট) রাতে সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজারে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, দাবদাহের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে ঘরে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর আগে গত শনিবার (৮ আগস্ট) রাতেও সিলেট-তামাবিল সড়কের শাহপরান এলাকায় একই দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছিলেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।
নগর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও করুণ। সেখানে দিনে অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ মেলে না। প্রতি ঘণ্টায় ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মারও বিকল হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তার ওপর গত দুদিনের অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের স্বাভাবিক চাহিদাও অনেক বেড়ে গেছে।
এ সংকট উত্তরণের চেষ্টা চলছে জানিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, তবে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সিলেটের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জানানো হয়, মঙ্গলবার বিকেল তিনটা পর্যন্ত দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি আগস্ট মাসে সিলেটে সর্বোচ্চ। এর আগে জুলাইয়ের ৪ তারিখে চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল এবং ওই মাসে আরও দুদিন তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি ছাড়িয়েছিল।
এদিকে, চরম লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেও ধস নেমেছে। প্রচণ্ড গরম ও বিদ্যুতের অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিশু ও প্রবীণরা। বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দাপ্তরিক কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, বিঘ্ন ঘটছে অনলাইননির্ভর কাজ ও পড়াশোনায়।
নগরের জিন্দাবাজার এলাকার পোশাক ব্যবসায়ী জাবের আহমদ বলেন, একদিকে গরমের কারণে বিক্রি কম, তার ওপর লোডশেডিং। কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ যায়, আর দীর্ঘ সময় আসার নাম থাকে না।
দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়ার কারণে ফ্রিজ-এসি চালু রাখা যাচ্ছে না। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে না পারায় অনেক জরুরি ও দামি ওষুধ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চাকরিজীবী কবির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা এখন সব সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছি। বিদ্যুতের অবস্থা এতটাই করুণ, তবুও কর্তৃপক্ষ সেদিকে নজর দিচ্ছে না।
নগরের শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা রাহেলা বেগম জানান, দিনে-রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করে। এমনকি রাত ১২টার পরেও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ চলে যায়, ফলে একটু শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগটুকুও মিলছে না।
এমতাবস্থায় জনদুর্ভোগ কমাতে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে নগর ভবনের সভাকক্ষে পিডিবি সিলেট অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখার আহ্বান জানান।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে পিডিবি সিলেট বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, মঙ্গলবার বিকেলে সিলেটে ২৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া গেছে, অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৭০ মেগাওয়াটের। এর আগের দিন ২৪৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৫ মেগাওয়াট এবং রোববার ২৩৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৬ মেগাওয়াটের ঘাটতি ছিল। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
.png)



