ভৈরবে ১০৪ অবৈধ জেটি, নাব্যতা সংকটে নওয়াপাড়া বন্দর

খুলনাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি নওয়াপাড়া নৌবন্দর। কিন্তু অবৈধ দখল, প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য এবং অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে বন্দরের প্রাণভোমরা ভৈরব নদ আজ অস্তিত্ব সংকটে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে নদীটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খনন ও একাধিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ফলে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নওয়াপাড়া বন্দরের কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, খুলনার মজুদখালি থেকে যশোরের আফরা পর্যন্ত নদীর দুই তীরের প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় নদী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অভয়নগরের ভাটপাড়া থেকে মহাকাল শ্মশানঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার এলাকায় নদী দখল ও অবৈধ স্থাপনার চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর দুই তীরে মাটি, বালু, কাঠ, বাঁশ, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত অবৈধ ঘাট, জেটি, গুদাম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন স্থাপনাই নয়, অভিযোগ রয়েছে নদীর জায়গা দখল করে কিছু সরকারি স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়েছে। আঞ্চলিক কর কমিশনারের কার্যালয় ও নওয়াপাড়া হাইওয়ে থানার সীমানাপ্রাচীর নদীর জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এছাড়া নওয়াপাড়া মাছবাজার থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নদীর ভেতরেই নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে একটি অটো রাইস মিল ও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর গুদামঘর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০৬ সালে নওয়াপাড়াকে নদীবন্দর ঘোষণা করার পর থেকেই শুরু হয় নদী দখলের প্রতিযোগিতা। একসময় নদীর তীরে ৮৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হলেও উচ্ছেদ অভিযানের পর সেগুলো আবারও গড়ে ওঠে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৫৯টি এবং ২০২০ সালে ২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। পরে ২০২২ সালে দুই দফায় ৭৫টি এবং ২০২৪ সালে আরও ২৪টি অবৈধ জেটি অপসারণ করা হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আবারও স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়। নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে নদীর বুকে ১০৪টি অবৈধ জেটি সক্রিয় রয়েছে।
নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বর্তমানে নদীতে ১০৪টি অবৈধ জেটিসহ অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে। প্রতিবছর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়। আবারও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৪৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ভৈরব নদ খনন প্রকল্প শুরু হয়। ২০২০ সালের মধ্যে সাড়ে ২৭ কিলোমিটার নদী খনন কাজ সম্পন্ন করা হয়। এরপরও নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ নওয়াপাড়া নৌবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহাবুল ইসলাম জানান, নাব্যতা বজায় রাখতে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দুটি ড্রেজার ও দুটি লং বুম দিয়ে পলি অপসারণের কাজ চলছে।
তবে ড্রেজিং কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন নওয়াপাড়া শাখার সাধারণ সম্পাদক নিয়ামুল হক রিকো বলেন, ড্রেজিং কার্যক্রমে চরম পরিকল্পনাহীনতা রয়েছে। নদীর মাঝখানে সরু চ্যানেল কেটে দুই পাশ অসমভাবে খনন করা হচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না, বরং নদী আরও দ্রুত নাব্যতা হারাচ্ছে।
নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জাহাজকে জোয়ারের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল হোসেন এশিয়া পোস্টে বলেন, নদীর মাঝে চর জেগে উঠছে। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে গম, চাল ও কয়লা পরিবহনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ভৈরব নদ রক্ষায় মৌসুমি উচ্ছেদ অভিযান কিংবা অপরিকল্পিত ড্রেজিং যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, নিয়মিত তদারকি এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।
এ বিষয়ে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে এশিয়া পোস্টবে বলেন, নওয়াপাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দরে নদীতীর দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রশাসনের উচিত অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের এবং সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা।
তিনি আরও বলেন, নদী ও নৌবন্দর রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য। অন্যথায় দেশের অন্যতম বৃহৎ এই নৌবন্দর অচিরেই তার কার্যকারিতা হারাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে একসময় ভৈরব নদ তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাবে এবং নওয়াপাড়া নৌবন্দরও ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে। তখন এর খেসারত গুনতে হবে শুধু যশোর বা খুলনাকে নয়, পুরো দেশকেই। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই ভৈরব নদ রক্ষার দাবি শুধু একটি নদী বাঁচানোর আহ্বান নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম।
