logo

কনসার্টে সিগারেট বিতরণ, তুমুল বিতর্কের মুখে ডাকসু নেতার পোস্ট

কনসার্টে সিগারেট বিতরণ, তুমুল বিতর্কের মুখে ডাকসু নেতার পোস্ট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে দেশের তিনটি ব্যান্ডকে নিয়ে ‘কুয়াশার গান’ শিরোনামে একটি চ্যারিটি কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক প্রত্যয়ে স্পিরিটস অব জুলাই ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) যৌথ আয়োজনে শনিবার এই কনসার্ট হয়। তবে, কনসার্টে সিগারেট বিতরণ নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। 

মূলত, কনসার্ট চলাকালে স্পন্সরে থাকা এক তামাক কোম্পানির ছায়া প্রতিষ্ঠান ‘এক্স ফোর্স’-এর করা স্মোক জোন ও বিনামূল্যে সিগারেট বিতরণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টিতে তীব্র সমালোচনার মুখে দুঃখ প্রকাশ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন কনসার্ট আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। 

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাতে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, প্রথমেই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও সিগারেট বিতরণকেন্দ্রিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। যদিও ডাকসু ও স্পিরিট অব জুলাইয়ের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কুয়াশার গান’ কনসার্টে স্পন্সরের সাথে যোগাযোগ, চুক্তি বা শর্ত নির্ধারণসংক্রান্ত কোনো আলোচনায় আমি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম না এবং কনসার্টটি আয়োজনে ডাকসুর শুধু আমিই যুক্ত ছিলাম। 

আমি যখন কনসার্টটিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই তখন ডাকসুর যে কয়জনের সঙ্গে আলাপ করি তাদের প্রত্যেকেই এতে অপোজ (বিরোধিতা) করে। কিন্তু তারপরও ‘যেসব শিক্ষার্থী কনসার্ট পছন্দ করে তাদের জন্য কনসার্ট আয়োজন করা উচিত’ এই চিন্তা থেকে আমি দৃঢ়তার সাথে কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করি। উল্লেখ্য, এর আগে নভেম্বরের লাস্ট সপ্তাহে আমি ৩ দিনব্যাপী একটি কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম (মাসখানেক দৌড়ে পুরো কনসার্টের ব্যয়ভারও ম্যানেজ হয়ে যায়)। তখন শেষ মুহূর্তে ডাকসুর ভিপি এবং জিএস দুজনই আমাকে জানান এটি না করতে। তখন আমি তাদের কথা অনুযায়ী কনসার্টটি না করে শিল্পী এবং স্পন্সরদের না করে দেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একটা অংশের ক্রমাগত প্রত্যাশা যে, ঢাবিতে একটি কনসার্ট হোক। সে প্রত্যাশা পূরণ করতেই ‘দ্য স্পিরিট অব জুলাই’-এর সাথে যৌথ আয়োজনে রাজি হই। 

এবারও ডাকসু ভিপি এবং বেশ কয়েকজন নেতা এই সিদ্ধান্তের আপত্তি জানালে আমি এক প্রকার জোর করেই এই কনসার্টটি আয়োজন করি। সুতরাং সম্পূর্ণ ডাকসু এতে যুক্ত ছিল না— পুরো ডাকসুকে এর জন্য দোষারোপ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এছাড়া আজকের কনসার্টে আমি ছাড়া ডাকসুর আর কেউ মঞ্চে উপস্থিতও ছিলেন না। ডাকসুর ভিপিকে বারবার অনুরোধ করলেও তিনি অসুস্থতাবোধ করছেন বলে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অন্য নেতাদের আহ্বান জানালেও তারা কেউ মঞ্চে আসেননি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে কনসার্টের স্পনসর প্রতিষ্ঠান ‘এক্স ফোর্স’ সম্পর্কে খোঁজ নেই এবং ঘাঁটাঘাঁটি করে অনলাইন অফলাইনে কিছুই খুঁজে পাইনি (আমার খোঁজার উদ্দেশ্য ছিল পেপসি কিংবা কোকাকোলা এই টাইপের কোনো বিতর্কিত কিংবা ফ্যাসিবাদের বা গণহত্যার সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিনা এটা যাচাই করা)। ‘এক্স ফোর্স’ বেশ কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একটি কনসার্ট আয়োজন করে। সেখানে কোনো নেতিবাচক বিষয় ঘটে থাকলে অবশ্যই ঘাঁটাঘাঁটিতে নজরে আসার কথা ছিল। কিন্তু আমি সেরকম কিছুই খুঁজে পাইনি।

স্পিরিটস অব জুলাই ২০২৪ সালে আর্মি স্টেডিয়ামে রাহাত ফাতেহ আলী খানকে নিয়ে ‘ইকোস অব রেভল্যুশন’ কনসার্ট আয়োজন করে। সেই কনসার্ট থেকে আয়কৃত ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তার জন্য প্রদান করে। এজন্য তাদের প্রতি আমার সফটনেস ও আস্থা ছিল।

আমি তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে ‘এক্স ফোর্স’ কী ধরনের প্রতিষ্ঠান? তাদের উত্তর ছিল এটা লাইফ স্টাইল প্রতিষ্ঠান, সম্পূর্ণ নতুন তৈরি হয়েছে। তারা ব্র্যান্ড প্রমোশন করার জন্য দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট আয়োজন করছে। তো স্বাভাবিকভাবেই আমি এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে ‘স্পিরিট অব জুলাই’-এর সাথে একত্রে কাজ করতে সম্মত হই।

এরপর আমরা কনসার্টটি পাবলিকলি অ্যানাউন্স করি প্রোগ্রামের দুই দিন আগে। তখন আমাদের যারা সমালোচনা করেন, ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে শুধরে দিতে চান আমার সেসব বন্ধ এই প্রোগ্রাম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। কোন ব্যান্ড ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ছিল, কোন ব্যান্ড ফ্যাসিবাদের সপক্ষে পোস্ট করেছে তার প্রত্যেকটিই খুঁটিনাটি বিষয় উল্লেখ করে আমাকে ফেসবুক পোস্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অবহিত করলে আমরা অনেক পরিশ্রমের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যান্ডগুলো রিপ্লেস করে শুধরে নেই। সে-সময়ে যদি কেউ ধরিয়ে দিতেন যে, ‘এক্স ফোর্স’ এই ধরনের কাজ করে থাকে তাহলে আমরা এটা থেকেও সরে আসতে পারতাম, শুধরে নিতে পারতাম। যে বিষয়গুলো ঘটেছে প্রত্যেকটিই ঘটেছে আমার জানার ঘাটতি থাকার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে।

‘এক্স ফোর্স’ বলেছিল সংগীতানুষ্ঠানের মাঠে তারা একটা ‘এক্সপেরিয়েন্স জোন’ করবে সেখানে বক্সিংসহ অনেকগুলো ইভেন্ট এবং ‘একটি স্মোকিং’ জোন করবে যাতে কনসার্টে আসা অন্যদের ধূমপানের কারণে কোনো সমস্যা না হয়। আমি এটা শুনে অনেক বেশি ইতিবাচক হই। আমি কনসার্টের পুরোটা সময় ধরে গেস্ট ও স্টেজ ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মাঠে কী হচ্ছিল সে ব্যাপারে অবগত ছিলাম না। কনসার্টের শেষদিকে আমি ফেসবুকে দেখতে পাই যে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তখন আর কিছু করার সুযোগ ছিল না। আমি অবগত ছিলাম না যে তারা স্মোকিং জোনের ভিতরে ফ্রিতে সিগারেট দেবে শিক্ষার্থীদের।

এই মিসম্যানেজমেন্টের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আমি আরও সতর্ক, দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করব। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সম্মান ও প্রত্যাশা পূরণই আমার প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য।

আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রতিটি আয়োজন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করেই পরিচালিত হওয়া উচিত। এই নীতিতে অটল থেকেই আমি সামনে এগিয়ে যেতে চাই।

আজকের আয়োজনে হওয়া ভুলত্রুটির সমালোচনা করে আমাকে শুধরে দেওয়ায় শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধন্যবাদ জানাই। যৌক্তিক সমালোচনাকে আমরা সবসময় সাদরে গ্রহণ করতে চাই। আমার সামনের পথচলায় ও আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত পরামর্শ আমার কাম্য। পরিশেষে সবার কাছে আবারও দুঃখ প্রকাশ করছি।