
মাদ্রাসায় নেই অধ্যক্ষের দেখা, কিন্তু মাস শেষে নিয়মিত পকেটে ঢুকছে বেতন। দীর্ঘ তিন বছর ধরে না গিয়ে শুধু কল ও মেসেজের মাধ্যমে চালাতেন প্রতিষ্ঠান। ক্যাশ বই কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সব ভাউচার—সবই রাখতেন নিজের কাছে! পরীক্ষার ফি থেকে শুরু করে নানা কাজের টাকা মাদ্রাসার ফান্ডে না গিয়ে জমা হতো তার নিজের কাছে! সম্প্রতি বিষয়টি সামনে এলে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমির হোসাইনকে প্রায় ৯৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মোহাম্মদ আমির হোসাইন মহেশখালী পুটিবিলা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি ১৬ বছর ধরে অবৈধভাবে পদটি দখল করে রেখেছিলেন এবং শেষ তিন বছর প্রতিষ্ঠানে না গিয়েও বেতন-ভাতা বাবদ এই বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করেছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের অনুরোধ ও শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক বিশেষ তদন্তে এই অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
সরেজমিন তদন্ত শেষে গত ২০ জুলাই কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সংস্থাটি। এতে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের মতো একাধিক অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়। টাকা ফেরতের পাশাপাশি তার এমপিও বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
২০০৪ সালের ২০ মার্চ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমির হোসাইন। ওই বছরের ২৩ আগস্ট গভর্নিং বডির সভায় তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। কিন্তু ২০১০ সালে কোনো বৈধ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তিনি পুনরায় অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন।
কোনো বৈধ ভিত্তি ছাড়াই ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাবদ তিনি মোট ৭৮ লাখ ১২ হাজার ৭৫ টাকা অবৈধভাবে গ্রহণ করেছেন।
তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৯ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বিনা অনুমতিতে একটানা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন আমির হোসাইন। পরিদর্শনের সময় তদন্ত কর্মকর্তাদের ফোন বা কোনো যোগাযোগেই তিনি সাড়া দেননি। স্থানীয় উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বাধ্যতামূলক উপস্থিতির নির্দেশ দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন তিনি সেখানে যোগ দেননি।
এই অনুপস্থিতিকালে তিনি অবৈধভাবে ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০০ টাকা বেতন-ভাতা তুলে নিয়েছেন। এই অর্থও ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ডিআইএ।
গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিজের বাসায়
মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, ক্যাশ বই, ভাউচার, ভর্তি রেজিস্টার ও ব্যাংক হিসাব বিবরণীসহ যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র তিন বছর ধরে অধ্যক্ষ কক্সবাজার শহরে তার নিজের বাসায় রেখে দিয়েছেন।
কোনো রেকর্ডপত্র মাদ্রাসায় না থাকায় তদন্তকারী দল প্রতিষ্ঠানের সঠিক আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে বিড়ম্বনার মুখে পড়ে।
কম্পিউটার ল্যাবের মালামাল চুরি
২০১৬ সালে সরকারিভাবে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের জন্য মাদ্রাসায় ১৭টি কম্পিউটার দেওয়া হয়। তদন্তে দেখা যায়, এর মধ্যে মাত্র ৯টি অবশিষ্ট আছে। সেগুলোরও অনেক যন্ত্রাংশের হদিস নেই। এই বিষয়ে অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অনুদান ও বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ
মাদ্রাসার প্রয়োজনে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে বরাদ্দ আনলেও তা প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় করেননি অধ্যক্ষ আমির হোসাইন। বিশেষত কক্সবাজার জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুদান ও উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ তিনি কৌশলে আত্মসাৎ করেছেন।
উপাধ্যক্ষ তদন্ত কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানিয়েছেন, এই অর্থ আত্মসাতের নেপথ্যে অধ্যক্ষের নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত ফিসহ বিভিন্ন উন্নয়নের টাকা অধ্যক্ষ তার গঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তারা মিলেমিশে তা ভোগ করেন।
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষিকা জান্নাত আরা বেগমও অধ্যক্ষের ছত্রছায়ায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বেতন ও পরীক্ষার ফি মূল তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন এবং এতে অধ্যক্ষ জড়িত বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। এ কারণে তারও বেতন-ভাতা স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে।
গভর্নিং বডি বাতিলের সুপারিশ
বছরের পর বছর ধরে অধ্যক্ষের অনুপস্থিতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় মাদ্রাসার গভর্নিং বডিকে দায়ী করেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এই ব্যর্থতার কারণে বর্তমান গভর্নিং বডি বাতিল করে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিআইএ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিতে বেসরকারি মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির শর্ত বিধিমালা-১৯৭৯ এবং বর্তমান জনবল কাঠামোর চরম লঙ্ঘন হয়েছে। ফলে পুরো টাকা ফেরত ও এমপিও বাতিলের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে এই অর্থ ফেরত না দিলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আমির হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে গত ২১ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন আগে আদালত, জেলা প্রশাসন ও তৎকালীন গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া একটি ঘটনাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
.png)


