বেরোবির ৬ উপাচার্যের ৫ জনই মামলার আসামি

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৭ বছরে দায়িত্ব পালন করেছেন ছয়জন উপাচার্য। তাদের মধ্যে তিনজন মামলায় বিভিন্ন সময়ে গেছেন কারাগারে এবং পাঁচজনের নামেই রয়েছে বিভিন্ন মামলা। বর্তমানে দুই সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশীদ ও ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ কারাগারে রয়েছেন। উপাচার্য হাসিবুর রশীদ গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আলোচনায় আসেন এই পাঁচ উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রফেসর ড. মো. লুৎফর রহমান। তবে মাত্র সাত মাসের মাথায় তাকে অপসারণ করা হলে দ্বিতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল মিয়া। দায়িত্ব পালনকালে ড. আব্দুল জলিল মিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ প্রদান এবং কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৩ সালের ৪ মে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করে গোপনে কানাডায় চলে যান।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই দুপুরে তিনি রংপুরের একটি আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। তবে তিনি বর্তমানে কারাগারের বাহিরে আছেন।
এরপর এ কে এম নুরুন্নবী তৃতীয় উপাচার্য এবং প্রফেসর ড. মো. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তারা দুইজনও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। তৃতীয় উপাচার্য এ কে এম নুরুন্নবী এবং চতুর্থ উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ—দুজনের বিরুদ্ধেই অর্থ আত্মসাৎ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অপব্যবহারের তদন্তে।
২০২৫ সালের ১৮ জুন দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এই দুই উপাচার্য, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
জানা যায়, প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি উপেক্ষা করে নকশা পরিবর্তন, ৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের চুক্তি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই সম্পাদন, এবং নিরাপত্তা জামানতের টাকা এফডিআর হিসেবে ব্যাংকে জমা রেখে ঋণ প্রদানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়াও প্রথম পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন উপেক্ষা করে দ্বিতীয় পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘনের শামিল। আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
২০২৫ সালের আগস্ট মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি এখন কারাগারে আছে।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এ কে এম নুরুন্নবী। তার পর চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম উপাচার্য ছিলেন ড. হাসিবুর রশিদ। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় তাকে প্রধান আসামি করা হয়। ওই মামলায় মোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছিল।
শনিবার (১৬ মে) রাত সাড়ে ৮ টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এতে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় উপাচার্যের মধ্যে দ্বিতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম উপাচার্য কারাগারে গেছেন। বর্তমানে চতুর্থ ও পঞ্চম উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ ও ড. হাসিবুর রশিদ কারাগারে আছেন।
এ ছাড়া বর্তমান ও ষষ্ঠ উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলীর বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের জুন মাসে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়োগ পরীক্ষায় আড়াই হাজার খাতা সৃজন, টেম্পারিং ও জালিয়াতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা হয়েছে। মামলাটি বর্তমামে চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
বেরোবি শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক মাসুদ রানা সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক পোস্টে লিখেন, বেরোবির মাটি অত্যন্ত পবিত্র। বেরোবির নুন খেয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়ে সম্মান নিয়ে ফেরত গেছে এমন নজির খুব কম। ছয়জন ভিসির মধ্যে ৩জনই জেল খেটেছেন দুর্নীতির দায়ে। আছেন শিক্ষক কর্মকর্তা বা কর্মচারী, ছাড় পাননি ছাত্রনেতারাও। যে যা-ই করেন সাবধান, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, সম্মান ইজ্জত সুনাম চিরস্থায়ী।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান পুলক লিখেন, বেরোবির ভিসি পদটা একটা কুফা পদ, এখানে যেই ভিসি হয় সেই মামলার আসামি হয় সঙ্গে গ্রেপ্তার। যার কারণে তিনজন ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হলো। বেরোবিতে ভিসি হওয়া মানে নিজের ক্যারিয়ার নিজের হাতে খেয়ে দেওয়ার মত। বেরোবি ভিসির পদ একটা রহস্য।
