Advertisement

মাদ্রাসাছাত্রীদের নিয়ে ফুটবল টিম গঠনের নির্দেশ, সামাজিকমাধ্যমে সমালোচনা

মাদ্রাসাছাত্রীদের নিয়ে ফুটবল টিম গঠনের নির্দেশ, সামাজিকমাধ্যমে সমালোচনা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের প্রতিটি মাদ্রাসায় দাখিল ও আলিম পর্যায়ের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফুটবল দল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। এ নির্দেশনা জারির পর দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

গত ২১ জুলাই বোর্ডের রেজিস্ট্রার প্রফেসর এস এম তৌহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’ সফলভাবে সম্পন্ন করতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় দাখিল অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি এবং আলিম পর্যায়ের ছাত্রীদের নিয়ে পৃথক ফুটবল টিম গঠন করে অভিজ্ঞ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনা প্রকাশ্যে আসার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ও অভিভাবক এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হান্নান নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এই সিদ্ধান্ত মুসলিম উম্মাহর (মুসলিম জাতি) ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পরিপন্থি। এটি মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর ‘অপসংস্কৃতি’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। অবিলম্বে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানাই।’

প্রশ্ন উত্থাপন করে রায়াত রায়হান নামের একজন লিখেছেন, ‘মাদ্রাসার ছোট থেকে বড় মেয়েদেরও খেলায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এই ছাত্রীরা বোরকা পরে খেলবে নাকি জার্সি পরে? তাদের প্রশিক্ষক পুরুষ হবে কি? মাঠে দর্শক হিসেবে কারা থাকবে? এসব বিষয় পর্দার বিধানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। নারীর পর্দা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আর মাদ্রাসার নারীরা যেহেতু পর্দা মেইনটেইন করার চেষ্টা করে, তাই তাদের ক্ষেত্রে পর্দার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আসছে। জেনারেল মেয়েদের হলে এ ক্ষেত্রে এই আলোচনা আনতাম না। নামের সঙ্গে মাদ্রাসা রেখে পর্দার বিধান লঙ্ঘন হলে এর খেসারত দিতে হবে।’

সরকারের এ ধরনের চিন্তার সমালোচনা করে ইমরান উদ্দিন নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সরকার আলিম এবং দাখিল শ্রেণির মেয়েদের বোরকা খুলে ফুটবল খেলাবে। কী পরিমাণ থার্ড ক্লাস চিন্তা! দেশের মাদ্রাসাগুলোর মেয়েরা ক্লাস থ্রি থেকে বোরকা পড়া শুরু করে। যারা ধার্মিক এবং ইসলামের পর্দার বিধানকে মানার চেষ্টা করে, তারাই বেশি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। সেই ছাত্রীদের ফুটবল খেলানোর মতো নিকৃষ্ট কাজ হাসিনাও করেনি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবির আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. যুবায়ের মোহাম্মদ এহসানুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলোর মূল পরিচয় হলো এগুলো ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশে দাখিল বা আলিম পর্যায়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ফুটবল টিম গঠন করা কোনোভাবেই শোভন কাজ নয়। সেখানে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গিও আছে। মাদ্রাসাছাত্রীদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া একেবারেই উচিত নয়।’

সব মাদ্রাসার জন্য ছাত্রীদের ফুটবল টিম গঠনের এই সাধারণ নির্দেশনা জারি করা মোটেও সঠিক হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, যদি কোনো মাদ্রাসা শুধু মেয়েদেরই মাদ্রাসা হয় এবং সেটি যদি যথাযথ সীমানা প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত থাকে বা যথাযথভাবে পর্দা মেইনটেইন করা যায়, তবে সেখানে নারী প্রশিক্ষকের অধীনে ছাত্রীদের শরীরচর্চা বা খেলাধুলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে নির্দেশনা জারি হলেও এটা পালন করা বাধ্যতামূলক নয় বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা বিজ্ঞপ্তিতে বাধ্যতামূলক লিখিনি। এটা একটা নির্দেশন—যেটা সিদ্ধান্ত হয়েছে মন্ত্রণালয়ে ‘প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ’ নিয়ে, সেটা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে স্কুল পর্যায়ে ছেলে-মেয়ে টিম আর কলেজ পর্যায়ে ছেলে-মেয়ে টিম। আমাদের আলিম পর্যায়েও ছেলে-মেয়ে টিম। এখন মনে করেন, একটা স্কুলে যদি একটা মেয়ে না থাকে তবে টিম হবে না। আবার মেয়ে আছে কিন্তু মেয়েরা কেউ খেলতে আসবে না, এটা তাদের ইচ্ছার ওপর।’

মেয়েদের টিম গঠনের বিষয়টি বাধ্যতামূলক নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা স্কুলে যেমন হতে পারে তেমনি মাদ্রাসার জন্য। একটা স্কুলে যদি মেয়েরা খেলতে চায় তবে টিম বানাবে, না চাইলে হবে না। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেটা তাদের প্রতিষ্ঠানগতভাবে তারা চিন্তা করবে এটাই আর কি।’