logo

ইউআইইউ গড়ল এশিয়ার নতুন রোভার ইতিহাস

ইউআইইউ গড়ল এশিয়ার নতুন রোভার ইতিহাস
ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য মার্স সোসাইটি আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) প্রতিযোগিতায় বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিক্স (সিএআইআর) দ্বারা পরিচালিত ইউআইইউ মার্স রোভার টিম। একইসঙ্গে এশিয়ার ২০ বছরের রোভার প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এটি একটি অনন্য অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউআইইউ’র দাবি, এই সাফল্য বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবময় ও ঐতিহাসিক মাইলফলক।

বিজয়ী দলকে বরণ, তাদের সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে রোববার (৭ ‍জুন) ইউআইইউ ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

ইউআইইউ কর্তৃপক্ষ জানায়, গত মাসের ২৭ থেকে ৩০ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা স্টেটের হ্যাঙ্কসভিলে অবস্থিত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে (এমডিআরএস) প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপে অসাধারণ দক্ষতা ও ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’ ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার এশিয়ার প্রথম দল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

ইউআইইউ স্ট্রাটিজিক কমিউনিকেশন অফিসের পরিচালক আবু সাদাতের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইউআইইউর ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য এবং ট্রেজারার ইঞ্জি. মো. আব্দুল মোকাদ্দেম, ইউআইইউ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স রিসার্চের (আইএআর) নির্বাহী পরিচালক এবং প্রফেসর এমেরিটাস ড. এম রিজওয়ান খান, ইউআইইউ স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংর ডিন প্রফেসর ড. হাসান সারওয়ার, রেজিস্ট্রার ডা. মো. জুলফিকার রহমান এবং ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের মেন্টর এবং ইউআইইউ কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক উৎকর্ষতার পথে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক যাত্রায় আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায় যুক্ত করল ইউআইইউ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইউআইইউ সংখ্যার চেয়ে মানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে নিজস্ব স্বাতন্ত্রত্ব তৈরি করেছে। ‘Quest for Excellence’ ইউআইইউর শুধু একটি স্লোগানই নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়টির সংস্কৃতি, কর্মদর্শন এবং প্রতিদিনের কাজের মানসিকতার প্রতিফলন। সেই ধারাবাহিক উৎকর্ষতার পথচলারই সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রোভার প্রতিযোগিতার বিশ্বমঞ্চ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে ।

চার দিনব্যাপী চূড়ান্ত রাউন্ডে, নিজেদের তৈরি সক্ষমতা এবং পরিচালন দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, চরম পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং এই চারটি মিশন সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করতে হয়েছে। ইউআইইউ মার্স রোভার সফলভাবে চারটি মিশনই সম্পন্ন করেছে এবং গর্বের সঙ্গে দেশের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে।

বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, ইউআইইউ মার্স রোভার টিম মর্যাদাপূর্ণ ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) ২০২৬ প্রতিযোগীতায় সর্বমোট ৪০৪.৪৪ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বের শীর্ষ রোভার দলগুলোর মধ্যে ৩য় এবং এশিয়া দলগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে। এছাড়াও প্রতিযোগিতার পোডিয়ামে স্থান পাওয়ার পাশাপাশি দলটি ‘বেস্ট অটোনামাস সিস্টেম’ স্বীকৃতি লাভ করেছে। চূড়ান্ত ফলাফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব এস অ্যান্ড টি মার্স রোভার ডিজাইন টিম ৪৬৯.৫৭ পয়েন্ট পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ নোভা রোভার ৪১২.৪১ পয়েন্ট পেয়ে ২য় স্থান এবং বাংলাদেশের ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ৪০০.৪৪ পয়েন্ট পেয়ে তৃতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

ইউআরসি আয়োজনের ব্যাপকতা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রকৃতি বিবেচনা করলে এই অর্জন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায় প্রাথমিকভাবে সারা বিশ্ব থেকে মোট ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় দল অংশগ্রহণ করে। একটি কঠোর ও কয়েকটি পর্যায়ের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার পর, যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহতে অবস্থিত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে (এমডিআরএস) চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য মাত্র ৩৮টি দলকে নির্বাচিত করা হয়। ইউআইইউ মার্স রোভার টিম শুধু বিশ্বের সেরা দলগুলোর মধ্যে যোগ্যতা অর্জনই করেনি, বরং শেষ পর্যন্ত বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের শক্ত স্থান নিশ্চিত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো এবং তুরস্ক থেকে মোট ৩৮টি দল গ্র্যান্ড ফাইনালে অংশ গ্রহণ করে।

এই অর্জন বাংলাদেশ এবং এশিয়া উভয়ের জন্যই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। অন-সাইট ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জের ২০ বছরের ইতিহাসে ইউআইইউ মার্স রোভার টিম প্রথম এশীয় দল হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ পোডিয়ামে স্থান করে নিয়েছে, যা একটি দীর্ঘদিনের বাধা ভাঙাসহ এই অঞ্চলে রোবোটিক্স ও মহাকাশ গবেষণা ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে একইসঙ্গে প্রমাণ করে, বাংলাদেশ তথা এশিয়া থেকেও বিশ্বমানের রোবোটিক্স প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের পরামর্শক হিসেবে ছিলেন ইউআইইউ স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন প্রফেসর ড. হাসান সারওয়ার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. সুমন আহমেদ। টিমের মেন্টর হিসেবে ছিলেন ইউআইইউ কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন। ইউআইইউ সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিক্সের (সিএআইআর) ৯ জন ছাত্র ছাত্রীদের একটি দল উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের টিম লিডার হিসেবে ছিল শাইফ আল শাদ। সিনিযর লিডে মো. মোসফিকুর রহমান, কো-টিম লিডে শেখ সাকিব হোসেন, মেকানিক্যাল টিম লিডে সিয়াম ইবনে সারওয়ার, অটোনমাস টিম লিডে মো. সালমান কবির চৌধুরী, সায়েন্স টিম লিডে আয়েশা আক্তার সায়মা, কমিউনিকেশন টিম লিডে সাব্বির আহমেদ, মেকানিক্যাল টিম মেম্বার হিসাবে মো. মিমতিয়াজে ইসলাম হিমেল এবং কমিউনিকেশন টিম মেম্বার হিসাবে মোহাম্মদ তাম্মায় নেতৃত্ব দিয়েছে।

ইউআইইউর দাবি, ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের এই সাফল্য এর শিক্ষার্থী, পরামর্শদাতা, ফ্যাকাল্টি মেম্বর এবং সমর্থকদের সমর্থন, নিষ্ঠা, উদ্ভাবন এবং অধ্যবসায়ের প্রতিফলন। রোবোটিক্স, স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এমবেডেড সিস্টেম এবং মেকানিক্যাল ডিজাইনে উন্নত গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে দলটি বিশ্ব মঞ্চে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।

এই অসাধারণ অর্জনের পেছনে শিক্ষার্থীদের মেধা, অধ্যবসায় ও উদ্ভাবনী শক্তির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইউনাইটেড গ্রুপের দূরদর্শী সহায়তা, উৎসাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি। ইউনাইটেড গ্রুপ সবসময় বিশ্বাস করে, বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রতিভা বিকাশই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির মূল ভিত্তি। শিক্ষা, গবেষণা অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা ইউআইইউকে আন্তর্জাতিক মানের একটি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।

এই অর্জন আরও একবার প্রমাণ করেছে, দূরদর্শী নেতৃত্ব, ফ্যাকাল্টি নির্দেশনা, শিক্ষার্থীদের প্রতিভা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশও বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে পারে। এছাড়াও এ অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরতে অনুপ্রাণিত করবে।