logo

জনবল সংকটে যবিপ্রবির মেডিকেল সেন্টার

জনবল সংকটে যবিপ্রবির মেডিকেল সেন্টার

জনবল সংকটে ধুঁকছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ডা. এম আর খান মেডিকেল সেন্টার। ডাক্তার, টেকনিশিয়ান, অ্যাম্বুলেন্স সংকটসহ প্রয়োজনের তিন ভাগের এক ভাগ জনবল থাকায় সার্বক্ষণিক মেডিকেল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু, অ্যাম্বুলেন্স সংখ্যা বৃদ্ধি, নারী চিকিৎসক ও চিকিৎসার শয্যা বৃদ্ধির দাবি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত ৩৪৯ জন শিক্ষক, প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী, ১৬৩ জন কর্মকর্তা ও ৩৪৬ জন কর্মচারীদের জন্য মাত্র একজন আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তাসহ মোট চিকিৎসক চারজন। প্যাথলজি বিভাগে যন্ত্রপাতি থাকলেও টেকনিশিয়ান না থাকায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে যেতে হয় ১৫ কিলোমিটার দূরে শহরের হাসপাতালে। এই যাতায়াতের জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি নষ্ট থাকায় একাধিক ব্যক্তি অসুস্থ হলে বিপাকে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দিনগুলোতে মেডিকেল বন্ধ ও ২৪ ঘণ্টা সেবা না থাকায় জরুরি সেবা নিতে ছুটতে হয় শহরে। এছাড়া নারী চিকিৎসক স্বল্পতা ও তাদের অনুপস্থিতির কারণে চিকিৎসা সেবা নিতে বিড়ম্বনায় পড়েন অনেক নারী শিক্ষার্থী। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, মেডিকেলে একটি শিফট চালাতে প্রয়োজনীয় পদসমূহের মধ্যে চিফ মেডিকেল অফিসার পদে একজন কর্মরত, ডেপুটি মেডিকেল অফিসারের একটি পদ শূন্য, সিনিয়র মেডিকেল অফিসারের দুটি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন একজন, মেডিকেল অফিসারের পাঁচটি পদের মধ্যে কর্মরত দুজন, নার্সের চারটি পদের মধ্যে কর্মরত দুজন এবং মেডিকেল এটেনডেন্টের তিনটি পদের বিপরীতে আছে দুজন। এক্স-রে টেকনিশিয়ান (রেডিওগ্রাফি) দুটি পদের বিপরীতে একজন আছে, এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও ল্যাব টেকনোলজিস্টের দুটি পদই শূন্য, মেডিকেল সহকারী পদে দুটির বিপরীতে একজন, অফিস সহকারী পদে দুটির বিপরীতে একজন এবং ক্লিয়ার হিসেবে দুটির বিপরীতে দুজন আছেন। এছাড়া একজন করে পিএ, স্টোর কিপার ও সিনিয়র কম্পাউন্ডার রয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের অর্ধেক দিয়েই চলছে মেডিকেলের ৮ ঘণ্টার এক শিফট সেবা। যেখানে ২৪ ঘণ্টায় তিন শিফটে মেডিকেল সেবা চালু থাকার কথা।

আরও জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের প্যাথলজি বিভাগে স্থায়ী পদ থাকলেও তাতে নেই কোনো জনবল। ফলে মেডিকেলে রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরিক্ষা। এছাড়া মেডিকেল সেন্টারে বেড সংকটও রয়েছে। বর্তমানে মাত্র পাঁচটি বেড থাকলেও একটি প্রকল্পের আওতায় ২০টি বেড বরাদ্দ পেয়েও স্থান সংকটের কারণে তা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। একাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে তাদের শহরের সদর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

মেডিকেল সূত্র জানায়, জনবল সংকটে সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে পারেন না তারা। তারপরও ডিউটি ভাগ করে প্রতি বৃহস্পতিবার এবং প্রতিদিন ইভেনিং শিফট রাত ৮টা পর্যন্ত চালু রেখেছেন তারা। এছাড়া তাদের ঔষধেরও সংকট রয়েছে, ঊর্ধ্বতনকে সে বিষয়ে জানানো হয়েছে। 

ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আল শাহরিয়ার রাফিদ বলেন, ২৪ ঘণ্টা মেডিকেল সেবা চালু থাকার কথা থাকলেও বৃহস্পতিবার শুক্রবারসহ যে কোনো ছুটির দিন বন্ধ থাকে মেডিকেল সেন্টার। রাতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে তাকে শহরে যেতে হয়, কারণ মেডিকেল বন্ধ থাকে। আবার অনেক সময় ডাক্তাররা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে না থেকে শহরের বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন। আবার মেডিকেলে কখনোই প্রয়োজনীয় ঔষুধ পাওয়া যায় না নাপা ছাড়া। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে মেডিকেলের সমস্যা সমাধান করে দ্রুত শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার চিকিৎসার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ইএসটি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজা আক্তার মিথি বলেন, মেডিকেল সেন্টারে সার্বক্ষণিক নারী চিকিৎসক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি চিকিৎসা সেবার মান উন্নত করতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। 

চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. দীপক কুমার বলেন, বর্তমানে এক শিফট সেবা দিতে যে লোকবল প্রয়োজন তার অর্ধেক রয়েছে। কিন্তু সেই জনবল দিয়ে আমরা ইভেনিং শিফট চালু করেছি। তবে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু করতে আমাদের এক শিফটের লোকবলের দ্বিগুণ প্রয়োজন। বিষয়টি আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি, তারা যদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তবে আমরা শিক্ষার্থীদের ভালো সেবা দিতে পারবো। 

এ বিষয়ে যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, মেডিকেল সেন্টারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি পূর্ণ অবগত। শূন্য পদগুলো পূরণের মাধ্যমে সেন্টারটিকে পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর করতে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি। খুব দ্রুতই শিক্ষার্থীরা এর সুফল দেখতে পাবে। আমার শিক্ষার্থীরা যাতে ক্যাম্পাসে সর্বোত্তম চিকিৎসা সেবা পায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।

উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে যবিপ্রবির বীর প্রতীক তারামন বিবি ছাত্রী হলের ডাইনিংয়ের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয় শতাধিক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে জনবল সংকটের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে শহরের আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া মেডিকেল সেন্টারের বেহাল দশা ও নারী চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছে শিক্ষার্থীরা।