রাবিতে হল প্রাধ্যক্ষকে হুমকির অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নবাব আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষকে ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে। হলের একটি কক্ষে অনুমতি ছাড়া অনাবাসিক ছাত্র ওঠানো হয়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) প্রাধ্যক্ষ সেখানে তালা ঝুলিয়ে দিলে এই হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযুক্ত মুরাদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি। তিনি ওই হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আতাউল্যাহকে মুঠোফোনে হুমকি দেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে পরে হলের কর্মচারীদের দিয়ে তালাটি খুলিয়ে দেন হল প্রাধ্যক্ষ।
হল সূত্রে জানা গেছে, প্রাধ্যক্ষের কোনো অনুমতি না নিয়েই দুই অনাবাসিক ছাত্রকে হলের ১৫৮ নম্বর কক্ষে তোলেন লতিফ হল ছাত্রদলের সভাপতি মুরাদ। গতকাল বিষয়টি জানতে পেরে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আতাউল্লাহ ওই দুই ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অফিসে ডাকেন। কিন্তু তারা প্রাধ্যক্ষের অফিসে না গিয়ে রুমে তালা দিয়ে হলের বাইরে যান। ঘটনার পর প্রাধ্যক্ষের নির্দেশে হলের কর্মচারীরা সেই কক্ষে আরেকটি তালা লাগিয়ে দেন। এরপর দুপুরে ছাত্রদল নেতা মুরাদ প্রাধ্যক্ষকে কল দিয়ে রুম খুলে দেওয়ার জন্য হুমকি দেন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে নবাব আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আতাউল্যাহ বলেন, ‘কাল দুপুর আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। ওপাশ থেকে একজন বলল, স্যার, আমি মুরাদ বলছি, লতিফ হল ছাত্রদলের সভাপতি। আপনি ওই রুমে তালা দিয়েছেন, ওই রুমে আমিই ওদের উঠিয়েছি। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, প্রভোস্টের কনসার্ন ছাড়া তুমি উঠাইতে পারো? পরে সে বলে ওরা গরিব মানুষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর সে (মুরাদ) আমাকে বলে, আপনি রুম খুলে দিবেন কি না, এইটা বলেন। আপনাকে আধাঘণ্টা সময় দিলাম। আপনি তালা খুলে দিলে দেন, না হলে আমি নিজে গিয়ে তালা ভেঙে ফেলব। অনেক কথার একপর্যায়ে সে আমাকে বলে, আপনি তো আর বেশিদিন নাই স্যার। তখন বললাম, যতদিন আছি, ততদিন তো আমি তো এই হলের প্রভোস্ট তাই না। হলে তো আমার কনসার্ন ছাড়া তুমি উঠাইতে পারো না। পরে বিশৃঙ্খলা এড়াতে আমি তালা খুলে দিতে বলি।
বিষয়টি নিয়ে প্রাধ্যক্ষ পরিষদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মিটিংয়ে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আগামী ২৫ তারিখে উপাচার্য ফিরলে তার সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা হবে। প্রাধ্যক্ষ পরিষদ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ করেছে।’
বুধবার (২০ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, ১৫৮ নম্বর কক্ষে বর্তমানে দুজন অনাবাসিক শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। জানতে চাইলে তারা দুজনেই এই হলে এলোটমেন্ট রয়েছে বলে জানান। তাদের মধ্যে একজন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান আপন এবং আরেকজন একই শিক্ষাবর্ষের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী জাবিদ।
কামরুজ্জামান আপন বলেন, তার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় হলের উপ-রেজিস্ট্রার করিম আলীর কাছে রুমে ওঠার জন্য তিনি আবেদন করেন। তিনি জানান, এই গণরুমটি ফাকা আছে এবং এখানে ওঠার জন্য পরামর্শ দেন। উপ-রেজিস্ট্রারের কথাতেই ওই রুমে ওঠেন বলে দাবি করেন তিনি।
কামরুজ্জামান ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক নাফিউল জীবনের অনুসারী বলে জানান।
তবে কামরুজ্জামানকে ওই রুমে থাকতে পরামর্শ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন হলটির উপ-রেজিস্ট্রার করিম আলী। তিনি বলেন, ‘আমি হলের মধ্যে এক চুল পরিমাণ কিছু করার আগেও সেটা প্রাধ্যক্ষ স্যারকে জানাই। আমি আরও সবসময় রুম খালি করার চেষ্টা করি। তবে ওরা যে বরাদ্দ ছাড়া কীভাবে আছে, সেটা জানি না।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নবাব আব্দুল লতিফ হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মুরাদ হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘সে (মুরাদ) ফোন দিয়েছে, নাকি অন্য কেউ ফোন দিয়েছে- তার সঙ্গে কথা বলে জানব। মুরাদও এ বিষয়ে আমাকে কিছুই অবহিত করেনি। বিষয়টা আমি টোটালি জানি না। এই নিয়ে আমাদের কাছে এখনো কেউ কোনো অভিযোগ করেনি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল প্রশাসনও বিষয়টি অবহিত করেনি। জানার পরে যদি আবেদন পাই, তাহলে পরবর্তীতে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
বিষয়টি নিয়ে প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শাহ হুসাইন আহমেদ মাহদী বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত একটাই, মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টন। সেখানে যারা মেধার বিপক্ষে অবস্থান নেবে, প্রশাসন তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আমার জানামতে সংশ্লিষ্ট হল প্রাধ্যক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছে। যেহেতু উপাচার্য দেশের বাইরে আছেন। ফিরলে এই বিষয়ে আলোচনা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন বলেন, হল প্রাধ্যক্ষ লিখিতভাবে বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন। উপাচার্য আসলে তিনি বিষয়টি দেখবেন। আমি উপাচার্যকে জানানোর জন্য তার পিএসের কাছে কাগজটি হস্তান্তর করেছি। তিনি যেহেতু দেশের বাইরে আছেন, ফিরলে আমরা এই বিষয়ে একসঙ্গে কথা বলব।
