logo

জাল সনদে চাকরির দায়ে বরখাস্ত নাজিম এখন কলেজ পরিদর্শক

জাল সনদে চাকরির দায়ে বরখাস্ত নাজিম এখন কলেজ পরিদর্শক

ভুয়া তথ্য ও জাল শিক্ষা (একাডেমিক) সনদ দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার হিসেবে চাকরি নেন নাজিম উদ্দিন আহমেদ ওরফে সিসিম। পরে সেই পদ থেকে পদত্যাগ করে দুই মাস পর সিনিয়র প্রোগ্রামার হিসেবে স্থায়ী পদে যোগ দেন তিনি। জানাজানি হলে অভ্যন্তরীণ তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়লে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তবে ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের পর নিজেকে বঞ্চিত দেখিয়ে চাকরি ফেরত নেন। এখন তাকে কলেজ পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। নাজিম উদ্দিনের শিক্ষাসনদ ও জীবনবৃত্তান্তসহ (বায়োডাটা) সব কাগজপত্র এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নেন নাজিম উদ্দিন। এর দুই মাস পর পদত্যাগ করে সেকশন অফিসার হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ পান। অথচ এই পদে তার আবেদনের যোগ্যতা ছিল না। দীর্ঘদিন এই পদে চাকরি করে তুলে নেন সরকারি বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন সুবিধা। পরে তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

কিন্তু ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নিজেকে বঞ্চিত দেখিয়ে সিনিয়র প্রোগ্রামার হিসেবে চাকরি ফেরত পান নাজিম উদ্দিন। পরে পদোন্নতি নিয়ে এখন তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শকের (ভারপ্রাপ্ত) পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

আরও জানা গেছে, নাজিম উদ্দিনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকা এবং পরে বরখাস্ত হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে পুনরায় নিয়োগ দিয়ে বর্তমানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব দিয়েছে। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নাজিম উদ্দিন ২০০৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর সনদ জমা দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি পদত্যাগ করেন এবং ২০০৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্থায়ী সিনিয়র প্রোগ্রামার হিসেবে পুনরায় নিয়োগ পান।

তবে ২০০৪ সালের ৪ জানুয়ারি জারি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সার্কুলারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, সিনিয়র প্রোগ্রামার পদের জন্য পদার্থবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিকস বা কম্পিউটার বিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি থাকতে হবে। অন্তত তিনটি প্রথম বিভাগ বা শ্রেণি থাকতে হবে, এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ন্যূনতম দুই বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সিসি++, জাভা ও এইচটিএমএলের মতো প্রোগ্রামিং ভাষায় দক্ষতা থাকতে হবে। তবে নাজিম উদ্দিন নিয়োগের সময় এসব একাডেমিক ও কারিগরি যোগ্যতা পূরণ করেননি। তবে প্রভাব খাটিয়ে তিনি যোগ্যতা ছাড়াই সিনিয়র প্রোগ্রামারে মেতো গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি নেন।

নাজিম উদ্দিনের দুটি জীবনবৃত্তান্ত বিশ্লেষণ করে দুই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। দুটি নিয়োগ নথিতে স্থায়ী ঠিকানা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে— সেকশন অফিসার পদে নিয়োগের সময় নোয়াখালীর কাশিপুর এবং সিনিয়র প্রোগ্রামার পদে নিয়োগের সময় নিজেকে ঢাকা জেলার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেন।

বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উঠলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই কমিটির তদন্তে এসব অসংগতি ধরা পড়ে। তদন্ত সংস্থার সুপারিশের পর নাজিম উদ্দিনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র অনুযায়ী, নাজিম উদ্দিনকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা তার নথিপত্র দ্রুত পরীক্ষা করে তাকে চাকরি থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।

কী বলা হয়েছিল তদন্ত প্রতিবেদনে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তে নাজিম উদ্দিনের জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের ১১ নম্বর ক্রমিকে নাজিম উদ্দিনের জালিয়াতি নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, পিতা— শামসুদ্দীন আহমেদ, বর্তমান পদ সিনিয়র প্রোগ্রামার। তিনি সেকশন অফিসার পদে ২০০৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রথম যোগদান করেন। জীবনবৃত্তান্তে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে নোয়াখালী জেলা উল্লেখ করেন। এর দুই মাস পর আবার সিনিয়র প্রোগ্রামার পদে ২০০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যোগদানের সময় স্থায়ী ঠিকানা ঢাকা জেলা উল্লেখ করেন। স্থায়ী ঠিকানা গোপন করা জালিয়াতির শামিল।

এ ছাড়া ২০০৩ সালের চাকরিবিধি মোতাবেক, ‘প্রোগ্রামারের (পরিবর্তিত পদ সিনিয়র প্রোগ্রামার) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ‘পদার্থবিদ্যা/ ইলেকট্রনিকস/ কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক (সম্মান)-সহ প্রথম শ্রেণির স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। শিক্ষাজীবনে কমপক্ষে তিনটি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিসহ অন্যান্য পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণি এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সি/সি++, জাভা, এইচটিএমএল- এ কাজে অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুই বছরের অভিজ্ঞতা। আইআইটি/সমমানের প্রতিষ্ঠান হইতে এমফিল/পিএইচডি ডিগ্রীধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’

২০০৭ সালের চাকরিবিধি মোতাবেক, সিনিয়র প্রোগ্রামার পদে যোগ্যতা ‘পদার্থবিজ্ঞান/ ফলিত ও তড়িৎ পদার্থবিজ্ঞান/ ব্যবসায় প্রশাসন অথবা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা সমমান। প্রোগ্রামার/সহকারী সিস্টেম এনালিস্ট হিসাবে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে ন্যূনপক্ষে ৪ বৎসরের অভিজ্ঞতা (কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ২ বৎসরের অভিজ্ঞতা)। ইনফরমেশন টেকনোলজি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরেই তৃতীয় শ্রেণি/বিভাগ গ্রহণযোগ্য নয়। উচ্চতর ডিগ্রি/প্রশিক্ষণ/যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীরা অগ্রাধিকার পাবেন’ উল্লেখ করা হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তে নাজিম উদ্দিনের জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সিনিয়র প্রোগ্রামার পদে চাকরিবিধিতে যে যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে নাজিম উদ্দিন আহমেদের ওই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সে রকম কোনো যোগ্যতা নেই। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন মর্মে তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন। তা ছাড়া সেকশন অফিসার পদে দুই মাসের অভিজ্ঞতায় তাকে সিনিয়র প্রোগ্রামার পদে পদোন্নতি/সরাসরি স্থায়ী নিয়োগ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান নেই। তা ছাড়া যোগদানের সময় কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকায় তার নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ ও চাকরিবিধির পরিপন্থি।

যা বলা হয়েছে দুদকে জমা দেওয়া আবেদনে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে একজন গত বছরের জুলাইয়ে নাজিম উদ্দিনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। সেই আবেদনেও প্রায় একই দাবি করা হয়েছে। আবেদনে তদন্ত করে নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় আর্থিক সুবিধা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আদায় করার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে এশিয়া পোস্টের পক্ষে নাজিম উদ্দিন আহমেদকে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় জেনে তিনি বলেন, আমি গাড়িতে আছি, কিছু শুনতে পাচ্ছি না; আপনি এক ঘণ্টা পর ফোন দিয়েন। এক ঘণ্টা পর তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো ফোনই রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটস অ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। 

পরদিন অন্য নম্বর থেকে ফোন করা হলে নাজিম উদ্দিন আহমেদ তার অফিসে দেখা করার প্রস্তাব দেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমান উল্লাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটি প্রায় ২২ বছর আগের ঘটনা। সম্প্রতি বিষয়টি শুনেছি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।