logo
Advertisement

বন্দুক-তলোয়ার থেকে রাজা-রানীর পোশাক, বদলে যাওয়া সিনেমার সাক্ষী কাশেম

বন্দুক-তলোয়ার থেকে রাজা-রানীর পোশাক, বদলে যাওয়া সিনেমার সাক্ষী কাশেম
কারওয়ান বাজারের ডিআইটি মার্কেটে নিজ দোকানে আবুল কাশেম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কারওয়ান বাজারের ডিআইটি মার্কেটের দ্বিতীয় তলার ছোট্ট দোকানটি যেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক নীরব স্মৃতিঘর। একসময় সিনেমা অঙ্গনে ছিল ব্যাপক জৌলুশ। নির্মাতা, শিল্পী ও চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষের আনাগোনায় সরগরম থাকত আবুল কাশেমের দোকানটি। একের পর এক কাজ আসত, ব্যস্ততায় কাটত দিন-রাত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের সেই চিত্র। আগের মতো কাজ নেই, নেই সেই ব্যস্ততাও। এখন দিনের বেশির ভাগ সময় ক্রেতা ও কাজের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় তাকে।

জীবনের সায়াহ্নে এসেও দীর্ঘদিনের এই পেশা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারছেন না আবুল কাশেম। কারণ, এটি তার কাছে কেবল জীবিকা নয়; বরং জীবনের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর সম্পর্ক। এই পেশার প্রতিটি পোশাক, সরঞ্জাম ও ব্যস্ত দিনের স্মৃতিতে মিশে আছে তার আবেগ, ভালোবাসা ও অসংখ্য না-বলা গল্প। তাই কাজ কমে গেলেও পুরোনো পেশাটিকে আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি—হয়তো একদিন আবারও তার ছোট্ট দোকানে ফিরবে সিনেমার সেই চেনা ব্যস্ততা।

১৯৭২ সাল থেকে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত মোহাম্মদ আবুল কাশেম। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজা-রানী, সেনাপতি, পুলিশ, জল্লাদসহ নানা চরিত্রের পোশাক এবং বন্দুক-তলোয়ারের মতো সরঞ্জাম ভাড়া দিয়ে আসছেন তিনি।

তার দেওয়া পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে পর্দায় হাজির হয়েছেন ববিতা, শাবানা, বাপ্পারাজসহ বাংলা চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় শিল্পী। রাজা-রানী, সেনাপতি, পুলিশ কিংবা জল্লাদের মতো নানা চরিত্রের সাজসজ্জায় তার সরবরাহ করা পোশাক ব্যবহৃত হয়েছে বহু সিনেমায়।

একসময় কাজের চাপ এতটাই বেশি ছিল যে তার সঙ্গে কাজ করতেন ১৮ জন সহযোগী। এখন সেই ব্যস্ততা নেই। আবুল কাশেম বলেন, আগে ইন্টারভিউ দেওয়ারও সময় পেতাম না। আমার সঙ্গে ১৮ জন সহযোগী কাজ করত। এখন একা একা বসে থাকি। দিনে এক-দুইজন কাস্টমার পাওয়াও কষ্ট হয়ে যায়।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের গল্প, নির্মাণশৈলী ও প্রযুক্তি। কমেছে পোশাকনির্ভর ও ঐতিহাসিক চরিত্রের কাজ। তার প্রভাব পড়েছে আবুল কাশেমের পেশাতেও। কমেছে আয়, কমেছে ব্যস্ততা। তবু দোকানটি ছাড়েননি তিনি।

আবুল কাশেম বলেন, এই পেশাটা ধরে রেখেছি শুধু এটি জীবনের সঙ্গে জুড়ে আছে বলে। এত বছর ধরে এই কাজ করেছি, এখন চাইলেও সহজে ছেড়ে যেতে পারি না।

তার দোকানের পোশাক ও সরঞ্জামগুলো এখন শুধু ব্যবসার সামগ্রী নয়, দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিও। কোনো পোশাক হয়তো উঠেছিল জনপ্রিয় কোনো শিল্পীর গায়ে, কোনো তলোয়ার ব্যবহৃত হয়েছিল কোনো যুদ্ধদৃশ্যে। প্রতিটি জিনিসের সঙ্গেই যেন জড়িয়ে আছে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি করে গল্প।

প্রযুক্তির পরিবর্তনে তার মতো নেপথ্যের কারিগরদের কাজও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে। হারিয়ে যাওয়ার পথে একটি পুরোনো পেশা। তাই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের পাশে সরকারি সহযোগিতা চান আবুল কাশেম।

তবু প্রতিদিন দোকানের সাটার তোলেন তিনি। হয়তো আগের মতো ভিড় হবে না, কোনো পরিচালকও হয়তো আসবেন না। তবু অপেক্ষায় থাকেন আবুল কাশেম।

কারণ সিনেমা তার কাছে শুধু পেশা নয়, জীবনের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সঙ্গী। ক্যামেরার আলোয় কখনো দেখা না গেলেও রূপালি পর্দার অসংখ্য চরিত্রের আড়ালে তার শ্রম মিশে আছে। কারওয়ান বাজারের সেই ছোট্ট দোকানটি তাই যেন বাংলা চলচ্চিত্রের হারিয়ে যেতে বসা এক সময়ের নীরব স্মৃতিঘর।