৩৬ বছরের জীবনে যে ইতিহাস লিখে গেছেন জহির রায়হান

ফাল্গুনের আগুনে জ্বলে ওঠা এক অমর রাজপথের নাম জহির রায়হান। হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকা অমর সাহিত্যিকের নাম জহির রায়হান। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র- তিন অঙ্গনেই নিজের স্বতন্ত্র প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাওয়া এই সৃষ্টিশীল মানুষটি মাত্র ৩৬ বছরের জীবনেই বাংলা সংস্কৃতিতে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যার আবেদন আজও অমলিন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, শোষিত মানুষের জীবন থেকে রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ- তার সৃষ্টির পরতে পরতে ধরা পড়ে সময়ের অস্থিরতা ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
আজ ১৯ আগস্ট, কিংবদন্তি এই কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতার ৯১তম জন্মবার্ষিকী।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তার পারিবারিক নাম আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। বাবা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক এবং পরে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন জহির রায়হান।
ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। অল্প বয়সেই কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তৎকালীন নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে কাজ করার সময় ‘রায়হান’ নামটি তার সঙ্গে যুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ভাষা আন্দোলনের রাজপথ থেকে সাহিত্যের পাতায়
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন জহির রায়হানের জীবন ও সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে মিছিল বের হয়েছিল, তার সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তারও হন।
ভাষা আন্দোলনের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে ফিরে আসে তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে। ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসে ভাষা আন্দোলনের আবহ যেমন শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে, তেমনি এর বহুল উচ্চারিত পঙ্ক্তি-‘আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হব’-পরিণত হয়েছে অধিকার ও প্রতিবাদের এক প্রতীকী উচ্চারণে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার প্রথম কবিতা ‘ওদের জানিয়ে দাও’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’। এরপর ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কত দিন’সহ একের পর এক সাহিত্যকর্ম পাঠকের হাতে আসে।
তার ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে উঠে এসেছে গ্রামীণ মানুষের জীবন ও সমাজবাস্তবতা। এই উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি লাভ করেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার। পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি- কিছু পুরস্কার মরণোত্তর।
সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু, চলচ্চিত্রে নতুন ভাষা
সাংবাদিকতা দিয়েই কর্মজীবনের শুরু জহির রায়হানের। ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় কাজ করার পর ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’, ‘সিনেমা’সহ বিভিন্ন প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে তার সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ ঘটে চলচ্চিত্রে।
১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে রুপালি জগতে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এরপর ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘সঙ্গম’, ‘বাহানা’সহ একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
‘সঙ্গম’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম উর্দু রঙিন চলচ্চিত্র। পরের বছর নির্মিত ‘বাহানা’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র। অর্থাৎ নিজের সময়ের চলচ্চিত্র প্রযুক্তি ও ভাষার সীমানা অতিক্রম করার ক্ষেত্রেও জহির রায়হান ছিলেন অগ্রগামী।
তার চলচ্চিত্রে শুধু বিনোদন ছিল না; ছিল সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের জীবনের গল্প। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম, বঞ্চনা ও প্রতিবাদ উঠে এসেছে তার নির্মাণে।
‘জীবন থেকে নেয়া’: চলচ্চিত্র যখন রাজনৈতিক ভাষা
জহির রায়হানের চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম মাইলফলক ‘জীবন থেকে নেয়া’। ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনা এই চলচ্চিত্রের প্রতীকী কাহিনির মধ্য দিয়ে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পায়। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় তুলে ধরেছিল এটি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়ে ছবিটি প্রদর্শন করেন জহির রায়হান। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটকের মতো বরেণ্য চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে ছবিটি প্রশংসিত হয়। প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন।
‘স্টপ জেনোসাইড’: মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমতের হাতিয়ার
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর কলকাতায় চলে যান জহির রায়হান। সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরতে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’।
গণহত্যার বাস্তব চিত্র ধারণ করে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চলচ্চিত্রকে তিনি তখন নিছক শিল্পমাধ্যম হিসেবে নয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরির শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
একজন শিল্পীর কাছে ক্যামেরা যে একই সঙ্গে প্রতিবাদ, দলিল ও প্রতিরোধের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে- ‘স্টপ জেনোসাইড’ তারই এক ঐতিহাসিক উদাহরণ।
স্বাধীনতার পরও থামেনি অনুসন্ধান
১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন জহির রায়হান। দেশে ফিরে তিনি নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের সন্ধান এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজে সক্রিয় হন। গঠিত হয় বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই অনুসন্ধান শেষ করার সুযোগ আর তার হয়নি।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হন তার বড় ভাই, প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি খবর আসে, তাকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে। ভাইকে উদ্ধারের আশায় জহির রায়হান সেদিন মিরপুরের উদ্দেশে রওনা হন। এরপর আর ফিরে আসেননি তিনি।
মিরপুরে তৎকালীন বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি নিহত হন বলে প্রচলিত বর্ণনা রয়েছে। তবে তার মরদেহ কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে জহির রায়হানের অন্তর্ধান আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় অধ্যায়।
তার মৃত্যুকে ঘিরে ভিন্ন দাবিও রয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নির্মল সেন দাবি করেছিলেন, মুজিববাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন জহির রায়হান। ফলে তার অন্তর্ধান নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
যে জীবন শেষ হয়নি
জহির রায়হানের জীবন থেমে গেছে ৩৬ বছর বয়সে। কিন্তু তার সৃষ্টি থামেনি। ‘হাজার বছর ধরে’র গ্রামীণ জীবন, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’র প্রেম, ‘আরেক ফাল্গুন’-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা, ‘জীবন থেকে নেয়া’র রাজনৈতিক প্রতীক আর ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর যুদ্ধের দলিল- সব মিলিয়ে তার সৃষ্টির ভুবন আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসেরই এক বিকল্প পাঠ।
তিনি ছিলেন একই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। মানুষের জীবন ও সময়কে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি তিনি তৈরি করেছিলেন, তা তার সময়কে ছাড়িয়ে গেছে।
আজও তার লেখা নতুন প্রজন্ম পড়ে, তার চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা হয়, ‘জীবন থেকে নেয়া’ ফিরে ফিরে দেখা হয়। ‘স্টপ জেনোসাইড’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্মরণ করা হয়।
জহির রায়হানের জন্মভূমি ফেনীও তাই শুধু একটি জেলার নাম নয়; এটি বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত একটি ভূখণ্ড। তার স্মৃতি, জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকেও নতুন করে দেখা যায়।
মাত্র ৩৬ বছরের জীবন। অথচ সেই জীবনের সৃষ্টিশীল বিস্তার যেন কয়েক শতাব্দীর সমান। সময় তাকে থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার গল্প থামেনি। তার ক্যামেরা থেমেছে, কিন্তু সেই ক্যামেরায় ধারণ করা ইতিহাস আজও কথা বলে।
আর তাই জহির রায়হান কেবল একটি নাম নন- বাংলাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক চেতনার এক অনন্ত প্রতিধ্বনি।


