logo

অস্কারের আলোয় মিশে গেল ফিলিস্তিনের আর্তনাদ

অস্কারের আলোয় মিশে গেল ফিলিস্তিনের আর্তনাদ

বিশ্ব আজ প্রভাবশালী দেশগুলোর যুদ্ধংদেহী আক্রোশের কাছে অসহায়। এবারের অস্কারের মঞ্চের ঝলমলে আলোর মধ্যেও ছড়াল সেই যুদ্ধবিরোধী মনোভাব। রোববার রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে ‘নো টু ওয়ার অ্যান্ড ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বাক্যযুগল ঝলমলে মঞ্চ থেকে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বব্যাপী। তারকা ভুবনে উচ্চারিত এ ছয়টি শব্দেই বিশ্ববিবেকের কাছে শান্তির পক্ষের বার্তা পৌঁছে গেল। থিয়েটারের আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় তারকাদের ভিড় আর কোটি কোটি দর্শককে সাক্ষী রেখে বুঝিয়ে দেওয়া হলো—শিল্পীর স্বাধীনতাকে কোনো রাষ্ট্রই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে না।

এবারের পুরস্কার মঞ্চে ডলবি থিয়েটারে সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করতে গিয়ে স্প্যানিশ তারকা হাভিয়ের বারদেম দৃঢ়চিত্তে বলে ওঠেন, ‘যুদ্ধ নয়, মুক্ত হোক ফিলিস্তিন।’ অস্কারজয়ী অভিনেতার মুখে যা শুনে ক্ষণিকের জন্য থমকে যায় হলের গুঞ্জন, তারপর ফেটে পড়ে হাততালিতে। হতবিহ্বল কাটিয়ে বারদেমের কথায় হাসিমুখে সায় দেন পাশে থাকা বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস।

এর আগে অস্কার অনুষ্ঠানের রেড কার্পেটে যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন হাভিয়ের বারদেমে। সেখানে প্যালেস্টাইনের সমর্থনে যুদ্ধবিরোধী বিশেষ ব্যাজ লাগানো পোশাকে পরেন তিনি। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক কোনান ও’ব্রায়েন তার উদ্বোধনী বক্তব্যে বর্তমান বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।

হাভিয়ের ও প্রিয়াঙ্কা মঞ্চে উঠেছিলেন সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের পুরস্কার তুলে দিতে। এ বছর এই বিভাগে দুটি আলোচিত ছবি ছিল—তিউনিসিয়ার পরিচালক কউথর বেন হানিয়ার ‘ভয়েস অব হিন্দ রজব’ এবং ইরানের জাফর পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’। যদিও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমা দুটি পুরস্কার জেতেনি; কিন্তু তাদের আবেদন ছিল বিশ্বব্যাপী। বিশেষ করে ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের গোলায় নিহত পাঁচ বছরের ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবের শেষ মুহূর্তের আর্তনাদ নিয়ে তৈরি সিনেমাটি গোটা দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। ব্র্যাড পিট ও জোয়াকিন ফিনিক্সের মতো তারকারা এই ছবির পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রযোজক হিসেবে।

অনেক তারকার পোশাকে সাঁটানো ছিল ‘নো ওয়ার’ পিন

ইরানের শাসকের রক্তচক্ষু এড়িয়ে গোপনে ধারণ করা জাফর পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ ছবিটিও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। শাস্তির ভয়ে পানাহি বর্তমানে দেশের বাইরে থাকলেও তার সিনেমা পৌঁছে গেছে বিশ্বমঞ্চে। তবে অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী ইহুদি লবিকে চটাতে না চাওয়ার কারণেই জুরিরা এই ছবিগুলোকে পুরস্কারের জন্য বেছে নেননি।

তারকাদের অভিব্যক্তিতেই উঠে আসে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব

এদিন হাভিয়েরের কোটে আটকানো ছিল দুটি ব্যাজ—একটি স্প্যানিশ ভাষায় ‘নো টু ওয়ার’, অন্যটি মুক্ত ফিলিস্তিনের বার্তা। পরে তিনি বলেন, ‘২০০৩ সালে ইরাকে আমেরিকার বেআইনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই ব্যাজ পরে অস্কারে এসেছিলাম। আজ আবার তেমনই এক মিথ্যা অজুহাতে তৈরি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। গাজায় ইসরায়েলের নরসংহারের প্রতিবাদ করা আমাদের দায়িত্ব।’

শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত ও মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন ফিলিস্তিনই নয়, এবারের অস্কারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ও অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ দেখা গেছে। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও অভিনীত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমাটি সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে ট্রাম্পের নীতির মুখে যেন এক সপাটে চড় মেরেছে। এ সিনেমায় অভিনয় করে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন শন পেন।

bigStoryContent

অন্যদিকে, সুজান স্যারান্ডন ও মার্ক রুফালোর মতো তারকারা আগে থেকেই ইসরায়েলকে বয়কটের ডাক দিয়ে আসছেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক কোনান ও’ব্রায়েন তার বক্তব্যে ট্রাম্প ও বিতর্কিত প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে নিয়ে বিদ্রূপ করতে ছাড়েননি।

তবে অস্কারের মঞ্চে একটি বিষয় ছিল বেশ লক্ষণীয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠার কাজটা এখনও করে চলেছেন প্রবীণ বা মধ্যবয়সী শিল্পীরা। নতুন প্রজন্মের টিমোথি শালামে, এমা স্টোনরা বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ সহিংসতা কোনো উচ্চারণই করেননি। তাদের এই নীরবতা, ভাবিয়ে তোলে নতুন প্রজন্মকে। এ নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও অন্তত রোববারের রাতটা শুধু শ্যাম্পেনের ফোয়ারায় ডুবে যেতে দেননি বয়স্ক শিল্পীরা। রাতটি প্রমাণ করল, অস্কার মানে কেবল শ্যাম্পেনের ফোয়ারা নয়; ঝাড়বাতির আলোর ওপারে থাকা নিষ্ঠুর পৃথিবীর কথাও মনে করিয়ে দেয় এই মঞ্চ।