৩৩ সিনেমাকে পেছনে ফেলে অস্কারের দৌড়ে মারাঠি ছবি ‘গোন্ধল’

ভারতের ৯৯তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে দেশটির আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে মারাঠি ভাষার থ্রিলার সিনেমা ‘গোন্ধল’। এবার বিশ্বজুড়ে দর্শকদের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে সিনেমাটির ট্রেলার। এর মধ্য দিয়ে অস্কারকে ঘিরে প্রচারের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল নির্মাতা সন্তোষ দাভাখারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের চলচ্চিত্র ফেডারেশন ৩৩টি সিনেমার মধ্য থেকে ‘গোন্ধল’কে অস্কারে পাঠানোর জন্য নির্বাচন করে। এর আগে ২০২৫ সালে ভারতের ৫৬তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালকের জন্য সিলভার পিকক পুরস্কার জেতেন সন্তোষ দাভাখার। ফলে অস্কারের দৌড়ে নাম লেখানোর আগেই চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে।
মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ জনপট, লোকজ আচার এবং মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সংঘাত- এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এগিয়েছে ‘গোন্ধল’-এর কাহিনি। সিনেমাটির নাম নেওয়া হয়েছে মহারাষ্ট্রের একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আচার থেকে। গান, নাচ, পৌরাণিক অনুষঙ্গ ও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে রাতভর চলে এই পরিবেশনা।
সিনেমার গল্পের কেন্দ্রে সুমন নামের এক তরুণী। ধনী স্বামী আনন্দের সঙ্গে দমবন্ধ করা দাম্পত্য সম্পর্কে আটকে থাকা সুমন নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চান। এ সময় গোন্ধল পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত সাহেবার প্রতি তার ভালোবাসা নতুন জটিলতা তৈরি করে। অন্যদিকে, গোন্ধল আচার নিয়ে আনন্দের আত্মীয় সারজেরাওয়ের গভীর আসক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন সুমন।
একটি ধর্মীয় আচারকে ঘিরে শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিপজ্জনক ষড়যন্ত্র, প্রতারণা ও অপরাধের গল্পে। ব্যক্তিগত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক প্রথা এবং মানুষের দুর্বলতার সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন পরিণতি ডেকে আনে, তারই আভাস মিলেছে ট্রেলারে।
সুমন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইশিতা দেশমুখ। সিনেমাটিতে আরও রয়েছেন কিশোর কদম, যোগেশ সোহোনি, নিশাদ ভোইর ও অনুজ প্রভু। ছবির গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন সন্তোষ দাভাখার নিজেই। চিত্রগ্রহণ করেছেন অমলেন্দু চৌধুরী।
সিনেমাটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর শুরুতে থাকা টানা ২৫ মিনিটের একটি দৃশ্য, যা কোনো দৃশ্যান্তর ছাড়াই ধারণ করা হয়েছে বলে নির্মাতাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই দীর্ঘ দৃশ্যের মধ্য দিয়ে গল্পের আবহ ও চরিত্রগুলোর টানাপোড়েনকে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
সিনেমাটির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ভারতের কিংবদন্তি সুরকার ইলাইয়ারাজা। দাভাখার ফিল্মসের ব্যানারে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন সন্তোষ দাভাখার ও দীক্ষা দাভাখার।
সন্তোষ দাভাখারের মতে, ভারতীয় সিনেমা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচলিত ধারণার বড় একটি অংশ দারিদ্র্য, জাতপাতের সংঘাত ও সামাজিক বৈষম্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় ভারতের বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও দেশটির সংস্কৃতি ও পরিচয়কে শুধু এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সংগীত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত সম্মিলিত স্মৃতিও দেশটির পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘গোন্ধল’-এর মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যের একটি দিককে সাংস্কৃতিক শিকড় অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তিনি।
নির্মাতার এই ভাবনার সঙ্গে ছবির গল্পের যোগসূত্র রয়েছে। মহারাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট লোকজ আচারকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এর কাহিনিতে উঠে এসেছে প্রেম, স্বাধীনতা, সামাজিক চাপ ও মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মতো সর্বজনীন বিষয়।
‘গোন্ধল’ নির্মাতা সন্তোষ দাভাখারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ২০২৫ সালে ভারতের ৫৬তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির জন্য সেরা পরিচালকের সিলভার পিকক পুরস্কার পান তিনি। উৎসবের বিচারকমণ্ডলী সিনেমাটিকে বাস্তবতার পটভূমিতে নির্মিত শেক্সপিয়রীয় উপাখ্যানের সঙ্গে তুলনা করেছিল।
২০২৬ সালে ভারতের আনুষ্ঠানিক অস্কার প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ছবিটি ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ আরও বেড়েছে। তবে অস্কারে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া আর চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া এক বিষয় নয়। এখন ছবিটির সামনে রয়েছে আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে পরবর্তী ধাপগুলো পেরিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ।
আঞ্চলিক ভাষার গল্প ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘গোন্ধল’ শেষ পর্যন্ত অস্কারের প্রতিযোগিতায় কত দূর এগোতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস