লাউয়াছড়ার বনে জুল ভার্নের সেই ছুটে চলা

অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ—জুল ভার্নের সেই কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা। যা আজও বিশ্বব্যাপী অ্যাডভেঞ্চার সিনেমার পথিকৃৎ বলেই বিবেচিত। যেন সেলুলয়েডের পর্দায় এক অসম্ভব রোমাঞ্চ। পকেট ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক উন্মাদনা—সিনেমাটির প্রতি পরতে পরতে ছিল অ্যাডভেঞ্চারাল উত্তেজনা। সিনেমা সম্পর্কে যারা সামান্যতম খোঁজখবরও রাখেন, তাদের প্রিয় সিনেমার তালিকায় ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ’ থাকবে নিশ্চিত। সিনেমাটি শুধু একটি গল্প নয়; এটি হলিউডের ইতিহাসের এক বিশাল মহাকাব্য। সিনেমাটি যেন বিশ্ব পরিভ্রমণে স্বয়ং জুল ভার্নের অনন্ত ছুটে চলা।
অনেকের কাছেই অজানা, ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অস্কারজয়ী হলিউড চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ’-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে দেখা যায় বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি। যেখানে দেখা গিয়েছিল বিশ্বভ্রমণের চ্যালেঞ্জে থাকা পিলেয়াস ফগের ট্রেন ছুটে চলছে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে। রয়েছে শ্রীমঙ্গলের অভয়ারণ্যে বন্যহাতির দৃশ্যও। মাইকেল অ্যান্ডারসন পরিচালিত এই ব্লকবাস্টার অ্যাডভেঞ্চার সিনেমায় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরা হয়েছিল।


সর্বকালের অন্যতম সেরা এ সিনেমাটির শুরু ১৮৭২ সালে লন্ডন ক্লাবের এক বাজি থেকে। পিলেয়াস ফগ নামের এক ব্রিটিশ দাবি করেন, তিনি মাত্র ৮০ দিনে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসতে পারবেন। যা ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল এক রকম অসম্ভব ও কল্পনাতীত। শুরু হয় সেই রোমাঞ্চকর যাত্রা।
সেই যাত্রায় পিলেয়াস ফগের সঙ্গী হয় গৃহভৃত্য প্যাসপারতু। এদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড থেকে পঞ্চান্ন হাজার পাউন্ড চুরির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ফগের পিছু নেয় গোয়েন্দা ফক্স। সেই আশি দিনের ভ্রমণে যতটা না প্রাকৃতিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে ফগকে, তার চেয়েও বেশি সমস্যা করেছে সেই গোয়েন্দা। যদিও শেষ পর্যন্ত ফগ নির্দোষ প্রমাণিত হন।
সিনেমাপ্রেমীরা জানেন, ফগ সাহেবের এই সফর মোটেও সহজ ছিল না। ভ্রমণের ঠিক দশ দিনের মাথায় সুয়েজ থেকে বোম্বে যাওয়ার পথে এলাহাবাদের কাছাকাছি বুন্দেলখন্ড নামের একটি জায়গায় আটকে যেতে হয় তাকে। সতীদাহ প্রথার নিষ্ঠুর শিকার হতে যাওয়া এক তরুণীকে বাঁচাতে এগিয়ে যান পিলেয়াস ফগ। নিজের জীবনকে বাজি রেখে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন আউদা নামের সুন্দরী নারীকে।

এর পরপরই আসে বাংলাদেশিদের জন্য সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সিনেমায় বিশ্বভ্রমণের মধ্যেই ট্রেনে করে ভারত থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পুরো অংশটুকুরই শুটিং হয় সিলেট অঞ্চলে। যার মধ্যে লাউয়াছড়া বনাঞ্চল, শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন, সিলেটের একটি চা-বাগান, কুশিয়ারা ব্রিজ ও আবহমান বাংলার চিরাচরিত দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে হাতির দৃশ্যও ধারণ করা হয়। লাউয়াছড়া বনের সেই রেললাইনে এখনো দাঁড়িয়ে ছবি তোলা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের একটি। সেখানে দাঁড়িয়ে যখন সেই বনের ভেতর দিয়ে ট্রেনের বাঁশি শুনবেন, আপনার অবচেতন মনে ডেভিড নিভেনের সেই অভিযানের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠবেই!
যদিও লাউয়াছড়ায় সিনেমাটির শুটিংয়ের এই মিথকে অনেকেই বিভ্রান্তমূলক বলে মানেন। লাউয়াছড়া বনের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-সিলেট রেলপথ। দুই পাশে ঘন সবুজ অরণ্য আর মাঝখানে রেললাইন—এই দৃশ্যটি হুবহু সেই সিনেমার ‘ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ অংশের আবহ তৈরি করে। ধারণা করা হয়, সিনেমার সেট ডিজাইনার এবং লোকেশন স্কাউটরা এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অথবা বনের কিছু ‘বি-রোল’ (পার্শ্ব দৃশ্য) এখানে ধারণ করা হয়েছিল, যা পরে মূল দৃশ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। যা-ই হোক না কেন, সরাসরি দৃশ্য ধারণ করা না হলেও এই বনের সঙ্গে সিনেমার যোগসূত্রটি বেশ গভীর।

আশি দিনের মধ্যে পুরো বিশ্ব প্রদক্ষিণের এই পর্বতসম কঠিন কাজ পিলেয়াস ফগকে বুদ্ধিমত্তা, শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছিল গৃহভৃত্য প্যাসপারতু। আবার আমেরিকা যাওয়ার পথে রেড ইন্ডিয়ানরা যখন ট্রেনে হামলা চালিয়ে প্যাসপারতুসহ আরও দুজনকে বন্দি করে রাখে, তখন সবাইকে বীরত্বের সঙ্গে উদ্ধার করেন ফগ।
আশি দিনে পিলেয়াস ফগের জীবনে ঘটে যায় নানা লোমহর্ষক ও রোমাঞ্চকর ঘটনা। শেষ পর্যন্ত নানা নাটকীয়তার পর নির্দিষ্ট সময়ের চব্বিশ ঘণ্টা আগেই ফগ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন।

আইএমডিবিতে ৬ দশমিক ৮ রেটিং পাওয়া ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ’ সিনেমাটি ১৯৫৬ সালে ২৯তম অস্কারে আটটি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়। যার মধ্যে পাঁচটি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। চলচ্চিত্রটিকে এখন পর্যন্ত হলিউডের সবচেয়ে বড় ফিল্ম প্রজেক্ট বলে ধরা হয়।
এই ঐতিহাসিক সিনেমাটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও পর্যটনের ইতিহাসে একটি গর্বের বিষয়।