প্রেম, শিহরন আর ভীতির এক মিশ্রণ ‘ড্রাকুলা’

অটোমানদের সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধে প্রিয় স্ত্রীকে হারানোর পর পনেরো শতকের ওয়ালাচিয়ার যুবরাজ ভ্লাদিমির ঈশ্বরের প্রতি আস্থা হারান। শোক ও ক্রোধে তিনি ঈশ্বরকে নিন্দা করেন এবং ত্যাগ করেন তার বিশ্বাস। এর ফলেই উত্তরাধিকারসূত্রে নেমে আসে এক চিরন্তন অভিশাপ—ভ্লাদিমির পরিণত হন ড্রাকুলায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়াতে থাকেন তিনি, ভাগ্য ও মৃত্যুকে অস্বীকার করে টিকে থাকেন একাকী ভুবনে। তার জীবনে একমাত্র আশা—হারানো স্ত্রীকে আবার ফিরে পাওয়া এবং পুনরায় ভালোবাসার জীবন অতিবাহিত করা।
এই করুণ ও রোমান্টিক ট্র্যাজেডিক কাহিনিকে উপজীব্য করেই বড় পর্দায় আসছে ‘ড্রাকুলা’। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি সব জল্পনা ও বিপত্তির অবসান ঘটিয়ে মুক্তি পেতে যাচ্ছে লুক বেসন পরিচালিত এই বহুল আলোচিত সিনেমাটি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রাম স্টোকারের ১৮৯৭ সালের বিখ্যাত উপন্যাস ড্রাকুলা অবলম্বনে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই ঘোষণার পর অপেক্ষার পালা শেষে এবার দর্শকের সামনে আসতে চলেছে ছবিটি। সুপারন্যাচারাল ভ্যাম্পায়ারধর্মী এই সিনেমার চিত্রনাট্যও লিখেছেন পরিচালক লুক বেসন নিজেই।
ড্রাকুলার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্কিন অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী ক্যালেব ল্যান্ড্রি জোন্স। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যার জন্য ড্রাকুলা অপেক্ষা করে আছে, সেই স্ত্রী মিনা মারের ভূমিকায় দেখা যাবে জোয়ে ব্লু-কে। গুরুত্বপূর্ণ পুরোহিতের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অস্কারজয়ী অভিনেতা ক্রিস্টাফ ওয়াল্টজ। ভ্যাম্পায়ার ঘরানার হরর-ফ্যান্টাসিকে দর্শকের সামনে জীবন্ত করে তুলতে ফ্রান্সের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এনএসডি এই সিনেমায় বিনিয়োগ করেছে প্রায় ৫২ মিলিয়ন ডলার।
গল্পে দেখা যায়, ড্রাকুলা তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীর পুনর্জন্মের সন্ধানে যুগের পর যুগ ঘুরে বেড়ান। এই অনুসন্ধান সহজ করতে তিনি তৈরি করেন এক বিশেষ ভ্যাম্পায়ারিক সুগন্ধি, যা নারীদের তার প্রতি আকৃষ্ট করে। সেই সুগন্ধির মাধ্যমেই তিনি খুঁজে ফিরতে থাকেন তার প্রিয়তমাকে।
প্রায় চারশ বছর পর প্যারিসে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সূত্রে সলিসিটর জোনাথন হার্কারের সঙ্গে পরিচয় হয় ড্রাকুলার। হার্কারের বাগদত্তা মিনাকে দেখে বিস্মিত হয়ে যান তিনি। ড্রাকুলা বুঝতে পারেন—এই মিনাই তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী, এলিজাবেটার পুনর্জন্ম। স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার আশায় হার্কারকে নিজের দুর্গে বন্দি করেন তিনি। সন্ন্যাসীদের রক্তে নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপনের সময় ড্রাকুলা প্যারিসে পাড়ি জমান। তার ভ্যাম্পায়ার অনুসারী মারিয়ার সহায়তায় তিনি মিনাকে খুঁজে বের করেন। সুগন্ধিটি ধ্বংস করে মিনাকে তার অতীত জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং তাকে ওয়ালাচিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যান। সেখানে ড্রাকুলা মিনাকে অনুরোধ করেন তাকে ভ্যাম্পায়ারে পরিণত করতে, যাতে চিরকাল একসঙ্গে থাকা যায়।
এদিকে বাগদত্তাকে হারিয়ে দিশাহীন হার্কার এক পুরোহিতের শরণাপন্ন হন। পুরোহিতের নেতৃত্বে একটি অভিযানি দল ড্রাকুলার দুর্গ অবরোধ করে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুরোহিত ড্রাকুলার মুখোমুখি হন এবং তাকে তার পাপের জন্য অনুতপ্ত হতে বলেন, যাতে মিনা চিরন্তন শাস্তির শিকার না হয়। শেষ পর্যন্ত ড্রাকুলা নিজেকে পুরোহিতের হাতে সমর্পণ করেন। মিনার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে তার বাহুতেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনি। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে এক অভিশপ্ত অথচ করুণ প্রেমকাহিনির।
‘ড্রাকুলা’ নিয়ে পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার লুক বেসন দারুণ উচ্ছ্বসিত। তিনি জানান, এই প্রকল্পে তার আগ্রহের মূল কারণ ড্রাকুলার গল্প নয়, বরং অভিনেতা ক্যালেব ল্যান্ড্রি জোন্স। ২০২৩ সালে ‘ডগম্যান’ সিনেমায় জোন্সের সঙ্গে কাজ করার পর তার সঙ্গে আবারও কাজ করার ইচ্ছা থেকেই বেসন বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিশ্চিত হন—জোন্সের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত চরিত্র ড্রাকুলাই।
উল্লেখ্য, ড্রাকুলার মতো ভয়ংকর চরিত্র নিয়ে কাজ করলেও লুক বেসন নিজে ভৌতিক চলচ্চিত্রের ভক্ত নন। এমনকি ড্রাকুলার গল্পও তার বিশেষ পছন্দের তালিকায় ছিল না। এ বিষয়ে বেসনের ভাষ্য, তিনি আসলে একটি ভৌতিক গল্প নয়, বরং একটি ট্র্যাজিক ও রোমান্টিক প্রেমের গল্প বলতে চেয়েছেন। যদিও গল্পে কিছু ভৌতিক উপাদান রাখা হয়েছে, তবে তার মূল আগ্রহ ছিল সেই মানুষের কাহিনি বলা—যে তার জীবনের ভালোবাসাকে ফিরে পেতে চারশ বছর ধরে লড়াই করে যায়।