শুটিংয়ে জীবন বাজি রেখেছিলেন তারা

হলিউড হোক কিংবা বলিউড—অ্যাকশন সিনেমার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো স্ট্যান্ট। অনেকেই হয়তো হিরো কিংবা ভিলেনের অতিমানবীয় ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ দৃশ্য দেখে পুলকিত হন। কিন্তু এসব দৃশ্য ধারণ কীভাবে করা হয়, তা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। রুপালি পর্দায় অ্যাকশন কিংবা ড্রামা সব ঝলমলে দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভয়, ঝুঁকি আর মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার গল্প।
দর্শক যে দৃশ্য কয়েক সেকেন্ডে উপভোগ করেন, সেই দৃশ্যের জন্য অনেক সময় তারকাদের দিতে হয়েছে জীবনের বড় মূল্য। বেশিরভাগ সময়ই এসব অ্যাকশনের পেছনে দৃশ্য ধারণে মূল ভূমিকা রাখেন স্ট্যান্টম্যানরা। তারপরও অনেক অভিনেতা সেসব ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে নিজেই অংশ নেন। বলিউডে এমন বেশ কিছু সিনেমা আছে, যেগুলোর স্ট্যান্ট দৃশ্যে শুটিংয়ের সময় তারকাদের জীবন সত্যিকার অর্থেই ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
অমিতাভ বচ্চনের মৃত্যু থেকে ফেরা
সিনেমা: ‘কুলি’ (১৯৮৩)
বলিউড ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর শুটিং দুর্ঘটনার একটি ঘটে অমিতাভ বচ্চনের ‘কুলি’ সিনেমায়। ছবিটি মুক্তির আগেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে যখন বিগ বি। একটি অ্যাকশন দৃশ্যে সহ-অভিনেতা পুনিত ইসরারের ভুলে পেটে গুরুতর চোট লাগে নায়কের। তীব্র সেই আঘাতে সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অমিতাভ বচ্চন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসবেন কি না, তাই নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। তার সুস্থতার জন্য সবাই প্রার্থনা করতে থাকেন। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি সুস্থ হন। সেই দুর্ঘটনা এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে।
মৃত্যুর দুয়ারে অক্ষয় কুমার
সিনেমা: ‘খিলাড়ি’ (১৯৯২)

হিন্দি সিনেমার অন্যতম সাড়া জাগানো অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমা ‘খিলাড়ি’। ১৯৯২ সালে অক্ষয় কুমার এই সিনেমা দিয়েই তারকাখ্যাতি পান। ওই সময় তার অ্যাকশন দৃশ্যগুলো সব শ্রেণির দর্শক পছন্দ করেন। বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্য নিজেই করার চেষ্টা করেন এবং এটি অক্ষয় কুমারের পছন্দও। ‘খিলাড়ি’ সিনেমার একটি দৃশ্যে মারামারির দৃশ্যে গুরুতর আঘাত পান তিনি। এছাড়াও এক সিমেনায় চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দেওয়ার সময় তার পা পিছলে যায়। মুহূর্তে থমকে যায় সব কিছু। কয়েক সেকেন্ডের ভুলে ট্রেনের নিচে পড়ার উপক্রম হয় তার। অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি। এ ঘটনার পর শুটিং ইউনিটে নীরবতা নেমে আসে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন অক্ষয় কুমার।
সার্জারির টেবিলে শাহরুখ খান
সিনেমা: ডর (১৯৯৩) ও কয়লা (১৯৯৭)

শাহরুখ খানের অন্যতম জনপ্রিয় দুটি সিনেমা ডর ও কয়লা। দুটি সিনেমাতেই অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিংয়ে পিঠে মারাত্মক আঘাত পান। প্রথমে ‘ডর’-এ চলন্ত ট্রেনের অ্যাকশন দৃশ্যে পা পিছলে পড়ে যান। ওই সময় ঘাড় ও পিঠে আঘাত পান। প্রথমে আঘাত গুরুতর মনে না হলেও পরে স্পাইন সমস্যার শুরু হয়। এতে তাকে প্রথমবারের মতো যেতে হয় চিকিৎসকের ছুরির নিচে। পরে ১৯৯৭ সালে ‘কয়লা’ সিনেমায় নিজেই আগুনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ স্ট্যান্ট করতে গিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হন। আগের চোটের সঙ্গে নতুন চোটে জেরবার অবস্থা হয় শাহরুখের। এসব আঘাতে তাকে একাধিকবার সার্জারি করাতে হয়।
দীপিকা পা মচকালেন, জ্ঞান হারালেন
সিনেমা: ‘বাজিরাও মাস্তানি’ (২০১৫)

দীপিকা পাড়ুকোনে সবসময়ই ভিন্ন ঘরানার চরিত্রে নিজেকে ভেঙে আবার গড়েছেন। সঞ্জয় লীলা বানসালির সাড়া জাগানো সিনেমা 'বাজিরাও মাস্তানি'তে তার 'লাভনী' ড্যান্স বলিউড অঙ্গনে এখনো আলোচিত। জনপ্রিয় এ নাচটির শুটিং করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন। তার দুই পায়েই তিনটি করে ব্যান্ডেজ লাগাতে হয়েছিল। একই সিনেমার একটি যুদ্ধদৃশ্যে ভারী পোশাক ও জটিল সেটে কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক ক্লান্তিতে জ্ঞান হারান। সে সময় চিকিৎসকরা জানান, আরও একটু দেরি হলেই বড় বিপদ ঘটতে পারত দীপিকার।
ধর্মেন্দ্রর ভয়ংকর স্ট্যান্ট
সিনেমা: ‘ফুল কা পাত্থার’ (১৯৭২)

বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা ধর্মেন্দ্র ১৯৬০ সালে ‘দিল ভি তেরা হম ভি তেরে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে নাম লেখান। খুব বেশি সময় নেননি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। ‘ফুল অর পাত্থার’, ‘আয়ে দিন বাহার কে’, ‘শোলে’র মতো সিনেমার মাধ্যমে তিনি অল্প সময়েই শীর্ষ অভিনেতার স্থানে পৌঁছে যান। তবে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় সিনেমা ‘ফুল অর পাত্থার’। ওই সিনেমার একটি অ্যাকশন দৃশ্যে ঘোড়ার গাড়ি থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন ধর্মেন্দ্র। একই সঙ্গে তার সঙ্গে থাকা কুকুরও আহত হয়। এতে মাথায় গভীর চোট পান তিনি। সেই সময় স্ট্যান্ট ডাবল ব্যবহার বেশি প্রচলিত না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রাকুল প্রীত সিং
সিনেমা: ইন্ডিয়ান ২ (২০২৪)

‘ইন্ডিয়ান-২’ সিনেমার একটি অ্যাকশন দৃশ্যে রাকুল প্রীত সিংকে ক্রেনে ঝুলিয়ে দ্রুত গতিতে ঘুরিয়ে নামানোর শুটিং চলছিল। হঠাৎ ক্রেনের ভারসাম্য ও টাইমিংয়ে গরমিল দেখা দেয়। এতে খুব জোরে সেটের কাঠামোয় আছড়ে পড়েন নায়িকা। গুরুতর আহত হলে রাকুলকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মাংসপেশিতে ও অভ্যন্তরীণ চোটে জেরবার অবস্থা। কয়েক সপ্তাহ হাসপাতাল আর বিশ্রামে থাকতে হয় ইন্ডিয়ান-২ সিনেমার নায়িকাকে। ক্রেন স্ট্যান্টের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর ভারতীয় সিনেমায় স্ট্যান্ট নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়।
সালমান খানের বিপজ্জনক শুটিং
সিনেমা: ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ (২০১৭)

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবার শুটিং করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন বলিউড ভাইজান সালমান খান। তবে ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ ছবিতে শুটিং করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। অস্ট্রিয়ায় বরফাচ্ছন্ন এলাকায় শুটিং চলছিল। সে সময় একটি দৃশ্যে সালমান খান প্রায় ৩০ ফুট উঁচু থেকে লাফ দেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও তীব্র ঠান্ডা ও জায়গা পিচ্ছিল থাকায় দেখা দেয় বিপত্তি। সামান্য ভুলেই পায়ে গুরুতর আঘাত পান সালমান। এ ছাড়াও সম্প্রতি লাদাখের বরফাবৃত এলাকায় চলছিল ‘ব্যাটল অব গালওয়ান’ সিনেমার শুটিং। সেখানেও একটি ফাইটিং দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় দুর্ঘটনায় পড়েন সালমান খান। এতে গুরুতর চোট পান ভাইজান। স্ট্যান্ট ব্যবহার না করে শুটিং করে আহত হওয়ায় ওই সময় আবেগঘন দৃশ্যের শুটিং হয়।