নায়িকা হতে চেয়েছিলেন শশীকলা, হলেন দাপুটে খলনায়িকা

রুপালি পর্দায় পা রেখেছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। পর্দার ঝলমলে দুনিয়ায় মসৃণ পথচলাও শুরু হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল দর্শকদের মায়া আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ‘মিষ্টি নায়িকা’র তকমা গায়ে লাগানো। কিন্তু নিয়তির পরিহাস কিংবা অভিনয়ের তীব্রতা—সবকিছুই তাকে দাঁড় করিয়ে দিল এক ধূসর চরিত্রের সামনে। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি শশীকলা ওমপ্রকাশ সায়গল। সিনেদুনিয়ায় তার আগমনের গল্পের বাঁকবদলে স্নিগ্ধ হাসির আড়ালে বেরিয়ে আসে এক করুণ কাহিনি। শেষ পর্যন্ত পর্দায় আদর্শবাদী নায়িকা হতে চেয়ে কীভাবে যেন হয়ে উঠলেন ভয়ংকর এক খলনায়িকা। ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রীতে ভূষিত করে।
শশীকলা বলিউডের শতাধিক সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। একজন নারী হিসেবে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেও যে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব—সেটি শশীকলাই দেখিয়েছেন। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুর আগে তিনি বেশ কয়েকবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত টানা ছয়টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মনোনয়ন রেকর্ড রয়েছে তার।

শশীকলার এই রূপান্তর বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক অজানা অধ্যায়। শুরুটা হয়েছিল ইতিবাচক আর আদর্শ এক চরিত্র দিয়ে; কিন্তু গল্পের শেষটা হলো অবিশ্বাস্য এক নেতিবাচকতায়। দর্শকদের হৃদয়ে নায়িকা হিসেবে জায়গা নিতে এসে উল্টো হয়ে গেলেন ঘৃণিত ও আতঙ্ক ছড়ানো খলনায়িকা।
বলিউড এই কিংবদন্তির জীবনটা কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম ছিল না। একটা সময় সংসার চালানোর জন্য তাকে অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে হতো। তবে ভাগ্য ঘুরে যায় মোহনীয় কণ্ঠের অধিকারী নূর জাহানের নজরে এসে। তিনি স্পাই ও স্ট্যান্ট ফিল্ম ছেড়ে হয়ে ওঠেন পর্দার একজন বিখ্যাত খলনায়িকা।

পাঁচ বছর বয়সে তিনি সোলাপুর জেলার বিভিন্ন মেলায় নৃত্য, সংগীত ও অভিনয় পরিবেশন শুরু করেন। কৈশোরে পৌঁছার আগেই তার বাবা দেউলিয়া হয়ে সপরিবারে চলে আসেন মুম্বাই। সেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মনভোলানো পারফরম্যান্স করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তখন মনে করা হতো, ছোট্ট শশীকলা ভবিষ্যতে অনেক খ্যাতি অর্জন করবে। কিন্তু পারিবারিক টানাপোড়েনে তার বাবা নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
পরিবার নিয়ে শশীকলার বাবা জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করতে লাগলেন। সপরিবারে মুম্বাই আসার পর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শশীকলা কোনো কাজ খুঁজে পেলেন না। নিরুপায় হয়ে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করলেন। সে সময় প্রভাত স্টুডিওতে একটি মাসে ১০০ রুপি বেতনের একটি চাকরি পেয়ে গেলেন। সেখানেই নূর জাহান শশীকলাকে দেখেন। আর একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। পরে 'জিনাত' সিনেমায় একটি কাওয়ালি গেয়ে নজরে আসেন। ১৯৪৫ সালে 'জুগনু'তে শশীকলা দিলীপ কুমারের ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন।

দিলীপ কুমারের বোনের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেন। পরে কয়েকটি চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। ১৯৪৯ সালে তিনি প্রথম নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন 'নাজারে' সিনেমায়। এরপর 'থেস', 'আরজু', এবং 'অজীব লড়কি'-র মতো চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৬৮ সালে রাজশ্রী প্রোডাকশনসের ব্যানারে 'আরতি' সিনেমায় শশীকলা একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান, যা এনে দেয় নতুন পরিচয়। সেই সিনেমাই ক্যারিয়ারের বাঁক বদল করে তাকে খলনায়িকার খ্যাতি এনে দেয়। সিনেমাটির দারুণ সাফল্য শশীকলাকে তার সময়ের একজন তারকা খলনায়িকায় পরিণত করে। বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে শশীকলা চলচ্চিত্র জগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন।

এত কিছুর পরও শেষ বয়সে এসে নায়িকা হতে না পারার হতাশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ভুল শশীকলাকে গভীর হতাশায় ডুবিয়ে দেয়। শশীকলা কিছু টিভি সিরিয়ালেও কাজ শুরু করেছিলেন, যা তাকে একটি নতুন পরিচয় দিয়েছিল। ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল হঠাৎ করে বহু আক্ষেপ বুকে ধারণ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি শশীকলা।