টাইগার শ্রফ থেকে সালমান খান, গুলিতে হামলার শিকার যে তারকারা

বলিউড তারকাদের ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা যেমন রয়েছে, তেমনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। কখনো বাড়ির বাইরে, কখনো ব্যক্তিগত গাড়িতে, আবার কখনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বন্দুকধারীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কেউ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছেন, কেউ হারিয়েছেন জীবন। সর্বশেষ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে অভিনেতা টাইগার শ্রফের নাম।
গত রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় অভিনেতা গুরুতর আহত না হলেও তার গাড়িচালক ও এক পথচারী গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বলিউড তারকাদের নিরাপত্তার বিষয়টি। এর আগে সালমান খান, রাকেশ রোশন, দিশা পাটানিসহ আরও কয়েকজন তারকার বাড়ি কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ পরিসরে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
এমন আলোচিত কয়েকটি ঘটনা জেনে নেওয়া যাক।
টাইগার শ্রফ
বলিউড অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের ছেলে টাইগার শ্রফ অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় অভিনয়ের জন্য পরিচিত। গত রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় মোটরসাইকেলে আসা তিন ব্যক্তি। তখন টাইগার একটি ফুটবল ম্যাচ শেষে ফিরছিলেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ঘটনায় অভিনেতা গুলিবিদ্ধ না হলেও তাঁর গাড়িচালক ও কাছাকাছি থাকা এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। হামলার পর টাইগারকে পুলিশি নিরাপত্তায় সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করে মুম্বাই পুলিশ। হামলার উদ্দেশ্য ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছেন তদন্তকারীরা। তবে কোনো অপরাধী গোষ্ঠীর দায় স্বীকারের দাবি থাকলেও তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সালমান খান
বলিউড সুপারস্টার সালমান খানকে ঘিরে আলোচিত হামলার ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল। সেদিন ভোরে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় তার বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান।
ঘটনার পর লরেন্স বিষ্ণোই গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে হামলার দায় স্বীকারের দাবি সামনে আসে। তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনার পর সালমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়। তারকার বাড়ির বাইরে এমন হামলা বলিউডের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করে।
রাকেশ রোশন
পরিচালক ও প্রযোজক রাকেশ রোশনও একসময় বন্দুকধারীদের হামলার শিকার হন। তিনি অভিনেতা হৃতিক রোশনের বাবা। ২০০০ সালের ২১ জানুয়ারি মুম্বাইয়ের সান্তাক্রুজ এলাকায় নিজের কার্যালয়ের কাছে হামলার শিকার হন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই হামলাকারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে তার বাঁ হাতে গুলি লাগে। গুরুতর পরিস্থিতির মধ্যেও প্রাণে বেঁচে যান এই নির্মাতা। সিনেমার ব্যবসা ও অর্থসংক্রান্ত বিরোধের প্রেক্ষাপটে সে সময় বলিউডের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে অপরাধী চক্রের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। রাকেশ রোশনের ওপর হামলাও সেই সময়ের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
গুলশান কুমার
ভারতের সংগীতজগতের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমারের পরিণতি হয়েছিল আরও ভয়াবহ। ১৯৯৭ সালের ১২ আগস্ট মুম্বাইয়ের আন্ধেরি এলাকায় একটি মন্দিরের বাইরে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাকারীরা তার শরীরে ১৬টি গুলি চালিয়েছিল। বলিউডের সংগীত ও চলচ্চিত্র ব্যবসার সঙ্গে অপরাধী চক্রের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে আলোচনা চলে আসছে, গুলশান কুমারের হত্যাকাণ্ড তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। তার মৃত্যু ভারতীয় বিনোদনজগতে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল।
দিশা পাটানি
২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে অভিনেত্রী দিশা পাটানির পরিবারের বাড়ির বাইরে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই বাড়িতে সে সময় তার পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি বাড়িটি লক্ষ্য করে প্রায় ১০ থেকে ১২ রাউন্ড গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়।
ঘটনার পর গোল্ডি ব্রার ও রোহিত গোদারা সংশ্লিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে হামলার দায় স্বীকারের দাবি ওঠে। দিশার বোন খুশবু পাটানির কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে সেটি ছিল হামলাকারীদের পক্ষের বক্তব্য; ঘটনার পেছনের সব কারণকে ওই দাবির ভিত্তিতে নিশ্চিত বলা যায় না।
পরে এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুই হামলাকারী পুলিশের অভিযানে নিহত হন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়। তারকার নিজের উপস্থিতি না থাকলেও পরিবারের বাড়ি লক্ষ্য করে এমন হামলা নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
এলভিশ যাদব
ইউটিউবার ও ‘বিগ বস ওটিটি ২’-এর বিজয়ী এলভিশ যাদবের বাড়িতেও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট ভোরে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬ এলাকায় তার বাড়ির বাইরে মোটরসাইকেলে আসা তিন ব্যক্তি গুলি চালান।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাকারীরা দুই ডজনের বেশি গুলি ছোড়েন। সে সময় এলভিশ বাড়িতে ছিলেন না। তবে তার পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ভেতরে ছিলেন। ঘটনায় কেউ আহত হননি। বাড়ির বিভিন্ন অংশে গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। পরে এ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়। হামলার উদ্দেশ্য জানতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
রাজীব রাই
‘গুপ্ত’সহ একাধিক জনপ্রিয় সিনেমার পরিচালক রাজীব রাইও বন্দুকধারীদের হামলার মুখে পড়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে মুম্বাইয়ে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সে সময় তিনি অপরাধী চক্রের কাছ থেকে হুমকি পাচ্ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজীব রাইকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলেও তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা হামলাকারীদের প্রতিহত করেন। ফলে প্রাণে বেঁচে যান এই নির্মাতা। নব্বইয়ের দশকে বলিউডের চলচ্চিত্র ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের প্রভাব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসত। রাজীব রাইয়ের ঘটনা সেই সময়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিরই একটি উদাহরণ।
এপি ধিলন
পাঞ্জাবি সংগীতশিল্পী এপি ধিলনের কানাডার বাড়ির বাইরেও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের এলাকায় তার বাড়ির বাইরে গুলি চালানো হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
ঘটনার পর লরেন্স বিষ্ণোই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দাবি সামনে আসে। ভারতীয় সংগীত ও বিনোদনজগতের তারকাদের লক্ষ্য করে হুমকি এবং কানাডায় বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তিত্বদের নিরাপত্তা নিয়ে এ ঘটনা আলোচনার জন্ম দেয়। তবে হামলার উদ্দেশ্য ও অপরাধী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্তের তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত দাবিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
কপিল শর্মা
ভারতীয় কমেডিয়ান ও টেলিভিশন উপস্থাপক কপিল শর্মার কানাডার রেস্তোরাঁও গুলিবর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারে এলাকায় তাঁর মালিকানাধীন ক্যাপস ক্যাফের বাইরে গুলি চালানো হয়। সে সময় রেস্তোরাঁটির ভেতরে কর্মীরা থাকলেও কেউ আহত হননি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এরপরও প্রতিষ্ঠানটিকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা সামনে আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব ঘটনার সঙ্গে অপরাধী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার দাবি উঠে এসেছে। কানাডায় দক্ষিণ এশীয় ব্যবসায়ী ও বিনোদনজগতের ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে সহিংসতার একাধিক ঘটনার মধ্যে কপিলের ক্যাফে ঘিরে হামলাগুলো বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
তারকাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
বলিউড তারকাদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপরাধী চক্রের প্রভাব, চাঁদাবাজি, হুমকি এবং জনপরিচিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পাশাপাশি কানাডায়ও ভারতীয় বিনোদনজগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে সর্বশেষ হামলার পর তাই আবারও সামনে এসেছে একই প্রশ্ন-তারকাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা প্রস্তুত? তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।