সীমান্তহীনা এক কিশোরীর আবেগঘন আখ্যান

এক সিরীয় কিশোরী ইসরা ও তার পরিবার যুদ্ধবিধ্বস্ত মাতৃভূমি থেকে পালিয়ে জার্মানিতে শুরু করে নতুন জীবন। উদ্বাস্তু হিসেবে বেড়ে ওঠার মানসিক পীড়ন, কৈশোরের আনন্দ এবং বড়দের সঙ্গে টানাপোড়েনে কিশোরীর হৃদয়কে করে ব্যথিত। যুদ্ধের পরিণতি, নির্বাসনের করুণ অভিজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রহস্য—জীবনের বাঁকবদলের সঙ্গে মিশে থাকে ওতপ্রোতভাবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত তবে প্রাণবন্ত ও সংবেদনশীল উদ্যমী সেই কিশোরীর এক মানবিকতার করুণ আর্তি উঠে এসেছে ‘ওয়ান ইন আ মিলিয়ন’-এ।
সিরীয় উদ্বাস্তু কিশোরীর বাস্তব জীবনধর্মী তথ্যচিত্রের পরিচালক ইতাব আজ্জাম ও ম্যাকিইনেস। দশ বছর সময় নিয়ে নির্মাতারা ধীরে ধীরে চিত্রায়ণ করেছেন বাস্তবমুখী এই ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র। এতটা সময় নিয়ে নির্মাণ করার পেছনে তারা যুদ্ধপরবর্তী জীবনের মর্মস্পর্শী কাহিনিগুলোর বাস্তব প্রতিচ্ছবি তুলে আনতে চেয়েছিলেন। অ-ভারতীয় হিসেবে বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগাচ্ছে ‘ওয়ান ইন আ মিলিয়ন’ সিনেমাটি।
অভিবাসীদের কেন্দ্র করে নির্মিত এবং শরণার্থী জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা এই ডকুমেন্টারি সানড্যান্সের ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি কম্পিটিশন বিভাগের সেরা তিনের একটি চলচ্চিত্রে জায়গা করে নেয়। আর ইতাব আজ্জাম ও জ্যাক ম্যাকইন্স অসাধারণভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলায় অর্জন করেন জুরি ও অর্ডিয়েন্স পুরস্কার।
সিনেমাটি বলতে গেলে শুরু হয় মূলত শেষ থেকে। সিরিয়ার শাসক বাশার আল-আসাদের দমনমূলক শাসনের পতনের পর সপরিবারে ইসরা আলেপ্পোয় ফিরে আসে। একসময়কার বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষে ঘেরা সেই নরকীয় ভূখণ্ডে সে নিজেকে এক অচেনা আগন্তুক মনে করে। তার কিশোরীমনে প্রশ্ন—যুদ্ধই কঠিন নয়, কঠিন হলো এর পরবর্তী পরিস্থিতি।
এরপর আসে সেই মুহূর্তে, যখন চলচ্চিত্র নির্মাতারা ইসরার সঙ্গে প্রথমবার দেখা করেন। ২০১৫ সালে, সিরিয়া থেকে পরিবারের পালিয়ে আসার পর, তুরস্কের ইজমিরের রাস্তায় সে সিগারেট বিক্রি করছিল। দেশ ছেড়ে ভবিষ্যতের চিন্তায় জার্মানি নিয়ে সে আশাবাদী হলেও তার বাবা তারেক ছিলেন হতাশ। ইসরা ও তার মা নিসরিন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চায়। শুরু হয় সাংসারিক টানাপোড়েন।
চরিত্রনির্ভর এ তথ্যচিত্রটি পরিণত হয় স্পষ্টভাষী নিসরিন, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা তারেক এবং ইসরার এক আকর্ষণীয় অনুসন্ধানে। ইসরার বিদ্রোহী সত্তা জেগে ওঠে এবং নিজের পরিচয়কে গ্রহণ করার পথ বাতলে দেয়।
যুদ্ধের পটভূমিতে তথ্যচিত্রটি নির্মাণে ইতাব আজ্জাম ও ম্যাকইনেসকে বিষয়বস্তুর প্রতি গুরুত্ব দিতে হয় বেশি। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিচারহীন ও সহানুভূতিশীল। যা হয়তো বেপরোয়া ও পরচর্চামূলক হয়ে উঠতে পারত, তা একটি খাঁটি, কোমল এবং সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টি হিসেবেই রয়ে গেছে। আকর্ষণীয় ও আবেগঘন আখ্যান তৈরি করার জন্য তাদের প্রচেষ্টা সমান কৃতিত্বের দাবিদার।
ডকুমেন্টারি সিনেমাটিতে সংক্ষিপ্ত ভাষার মাধ্যমে পর্দায় যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের বেড়ে ওঠার এক বিশেষ মর্মস্পর্শী আবেদন রয়েছে। মাইকেল অ্যাপটেডের যুগান্তকারী তথ্যচিত্র সিরিজ ‘আপ’-এর মতো কয়েক দশক ধরে খণ্ডিত অধ্যায়ে হোক, কিংবা রিচার্ড লিঙ্কলেটারের ‘বয়হুড’-এর মতো কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নাটকীয় কাঠামোর মধ্যেই হোক। পরিচালক ইতাব আজ্জাম ও জ্যাক ম্যাকইনেস এমন একটি বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, যাকে ‘গার্লহুড’ বলা যেতে পারে।
মোদ্দাকথা, ‘ওয়ান ইন আ মিলিয়ন’ হলো সেই ক্রান্তিকালীন অদম্য বিষণ্ণতার মধ্যেও একটি মেয়ে এবং একটি পুরো সম্প্রদায়ের মানবিক সহনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতার এক অকুণ্ঠ উদযাপন।