বক্স অফিসের ব্যর্থ সিনেমা অস্কারে পাঠাল ভারত

রণবীর সিংয়ের তারকাবহুল ‘ধুরন্ধর’ কিংবা বক্স অফিসে সাড়া জাগানো বড় বাজেটের সিনেমাগুলোকে পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে একটি মারাঠি সিনেমা। নাম ‘গোনধল’। ৯৯তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে ভারতের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পেয়েছে সন্তোষ দাভখরের এই সিনেমা।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া ৩৩টি সিনেমার মধ্য থেকে ‘গোনধল’-কে অস্কারের জন্য নির্বাচিত করে। প্রতিযোগিতায় হিন্দি, মারাঠি, তেলুগু, গুজরাটি, তামিল, মালয়ালম ও নাগামিজ ভাষার সিনেমা ছিল। শেষ পর্যন্ত তারকাখচিত বড় বাজেটের ছবির বদলে আঞ্চলিক সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই সিনেমাকেই বেছে নেয় ১৪ সদস্যের জুরি।
এখানেই তৈরি হয়েছে কৌতূহল, বক্স অফিসে বড় সাফল্য পাওয়া সিনেমাগুলোকে পেছনে ফেলে কেন ‘গোনধল’?
‘গোনধল’-এর অস্কারযাত্রার আলোচনায় বারবার সামনে এসেছে সিনেমাটির গল্প, নির্মাণশৈলী ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার জুরি সদস্য বিবেক ভাসওয়ানি জানিয়েছেন, সিনেমাটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সাফল্য বা তারকার জনপ্রিয়তার চেয়ে গল্পের মৌলিকত্ব ও আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে সেটি কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে- এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভাসওয়ানির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৪ সদস্যের জুরি বোর্ডে ‘ধুরন্ধর’-এর পক্ষে ভোট পড়েছিল চারটি। অন্যদিকে ‘গোনধল’ শুরু থেকেই জুরি সদস্যদের আলোচনায় ছিল। অর্থাৎ, সিনেমাটি অস্কারে ভারতের প্রতিনিধি হয়েছে মূলত তারকা বা বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণে নয়; বরং গল্প বলার ধরন, সাংস্কৃতিক শেকড় এবং চলচ্চিত্র হিসেবে এর আলাদা পরিচয়ের কারণে।
‘গোনধল’-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর গল্পের পটভূমি। গ্রামীণ মহারাষ্ট্রের বহু পুরোনো লোকজ আচার ‘গোনধল’-কে কেন্দ্র করেই সিনেমাটির কাহিনি এগিয়েছে।
‘গোনধল’ মূলত দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি ঐতিহ্যবাহী লোকজ আচার ও পরিবেশনা। রাতভর চলা এই আয়োজনে থাকে দেব-বন্দনা, সংগীত, নৃত্য ও নানা ধর্মীয় আচার। সেই আবহকেই সিনেমায় ব্যবহার করেছেন নির্মাতা সন্তোষ দাভখর।
তবে এটি কেবল কোনো লোকজ সংস্কৃতির তথ্যচিত্র নয়। বরং সেই আচারকে ঘিরে মানুষের সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, গোপন সত্য, প্রতারণা ও টিকে থাকার লড়াইকে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে।
সিনেমার গল্পে সুমন নামের এক নারীকে দেখা যায়, যিনি অসুখী দাম্পত্য সম্পর্কে আটকে আছেন। নিষিদ্ধ এক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং একটি বিপজ্জনক পরিকল্পনা ধীরে ধীরে তাকে এমন এক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়, যেখানে লোকাচারের উৎসবমুখর পরিবেশের আড়ালে বেরিয়ে আসতে থাকে মানুষের অন্ধকার দিক।
‘গোনধল’ ভারতের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর। শুরুতে সিনেমাটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। কিন্তু মুক্তির পর চলচ্চিত্র উৎসবের যাত্রায় ছবিটির ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অব ইন্ডিয়ায় নির্মাতা সন্তোষ দাভখর জিতে নেন সেরা পরিচালকের ‘সিলভার পিকক’ পুরস্কার। জুরি সিনেমাটির ঐতিহ্য, নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার নির্ভুলতার প্রশংসা করে।
এরপর বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও ‘গোনধল’ পায় ফিপ্রেসকি পুরস্কার। পুণে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও থার্ড আই এশিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও নির্মাতা সন্তোষ দাভখর সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি পান। ফলে প্রেক্ষাগৃহে সীমিত ব্যবসা করা সিনেমাটি ধীরে ধীরে উৎসবের পরিসরে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করে।
‘গোনধল’ অস্কারে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা চতুর্থ মারাঠি সিনেমা। এর আগে ‘শ্বাস’, ‘হারিশচন্দ্রাচি ফ্যাক্টরি’ ও ‘কোর্ট’ ভারতের আনুষ্ঠানিক অস্কার এন্ট্রি হয়েছিল। তবে ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হওয়া মানেই অস্কারের চূড়ান্ত মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়া নয়। এবার ‘গোনধল’-কে অ্যাকাডেমির পরবর্তী বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
অস্কারে ভারতের প্রতিনিধি হওয়ার পর নতুন করে দর্শকের সামনে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সিনেমাটির নির্মাতারা। আগামী ৯ অক্টোবর থেকে মুম্বাই, দিল্লি, চেন্নাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে শুরু হচ্ছে বিশেষ প্রদর্শনী। এরপর মারাঠির পাশাপাশি হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম ও কন্নড় ভাষাতেও সিনেমাটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
৯৯তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ১৪ মার্চ। তার আগে ২১ জানুয়ারি ঘোষণা করা হবে চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকা।
বক্স অফিসের হিসাব দিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেকটা নীরবভাবে, সেই ‘গোনধল’-ই এখন ভারতের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চের পথে। সিনেমাটির সামনে এখন একটাই প্রশ্ন-অস্কারের চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকায়ও কি জায়গা করে নিতে পারবে মহারাষ্ট্রের লোকজ সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছোট পরিসরের গল্প?
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস