মাত্র ৩ কোটি রুপির সিনেমার আয় ১১৪ কোটি

মুক্তির প্রথম দিনে আয় ১০ লাখ রুপিরও কম। প্রথম সপ্তাহে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনী ছিল মাত্র ৬০টি। এমন সূচনা দেখে সিনেমাটির বক্স অফিস ভাগ্য নিয়ে বড় কোনো প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু দর্শকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গল্প বদলে দিয়েছে সব হিসাব। মাত্র তিন কোটি রুপির কম বাজেটে নির্মিত কন্নড় সিনেমা ‘প্রেমাদা ওরালি’ মুক্তির ২৯ দিনে বিশ্বজুড়ে আয় করেছে ১১৪ কোটি রুপির বেশি।
সিনেমাটির এই সাফল্য এখন ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে আলোচনার বিষয়। বড় তারকার উপস্থিতি কিংবা বিপুল প্রচারের ওপর নির্ভর না করে কীভাবে একটি স্বল্প বাজেটের সিনেমা দর্শকের মন জয় করে বক্স অফিসে এমন সাফল্য পেল, তা নিয়েই চলছে আলোচনা।
কন্নড় সংবাদমাধ্যম নিউজ কর্ণাটকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯তম দিনে বিশ্বজুড়ে ‘প্রেমাদা ওরালি’র মোট আয় ১১৪ কোটি রুপি ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে, বিনোদনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম পিংকভিলার হিসাব বলছে, মুক্তির ২৯ দিনে ভারতের প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১০৩ কোটি ৫০ লাখ রুপি। বক্স অফিসের এসব হিসাব বিভিন্ন বাণিজ্যিক সূত্রের অনুমানভিত্তিক, চূড়ান্ত আয় এর সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর সীমিতসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় মনোজ কুমার পরিচালিত ‘প্রেমাদা ওরালি’। প্রথম দিনে সিনেমাটির আয় ছিল ১০ লাখ রুপিরও কম। প্রথম সপ্তাহে মাত্র ৬০টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হওয়া ছবিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও তাই সংশয় ছিল।
কিন্তু দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। প্রথম সপ্তাহের তুলনায় পরের সপ্তাহগুলোতে আয় বাড়তে থাকে। পিংকভিলার হিসাব অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম সপ্তাহে ভারতে সিনেমাটি আয় করে ৬ কোটি ২৫ লাখ রুপি। দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ কোটি ৭৫ লাখ রুপিতে। তৃতীয় সপ্তাহে আয় হয় ৩৯ কোটি রুপি।
চতুর্থ সপ্তাহেও দর্শকের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। মুক্তির ২২তম থেকে ২৯তম দিন পর্যন্ত আট দিনে সিনেমাটির আয় হয় ৩০ কোটি ৫০ লাখ রুপি। অর্থাৎ, এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ কোটি ৮১ লাখ রুপি আয় করেছে ছবিটি। তবে ২৯তম দিনে আয় কমে আনুমানিক ২ কোটি রুপিতে নেমে আসে।
শুরুর দিকে সীমিত প্রদর্শনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও দর্শকের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে কর্ণাটকে সিনেমাটি ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। ছবিটির মোট আয়ের বড় অংশ এসেছে নিজ রাজ্য থেকেই।
‘প্রেমাদা ওরালি’র সাফল্যের গল্পে বক্স অফিসের অঙ্কের পাশাপাশি রয়েছে নির্মাতাদের সংগ্রামের কাহিনিও। সিনেমাটি নির্মাণ করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন পরিচালক মনোজ কুমার। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কাজ শেষ করার জন্য নিজের মূল্যবান জিনিসপত্র বন্ধক দেওয়ার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাকে।
অন্যদিকে, বড় বাজেটের সিনেমার মতো প্রচারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থও ছিল না নির্মাতাদের হাতে। তাই দর্শকের কাছে পৌঁছাতে বেছে নিতে হয় ভিন্ন পথ। ছবির অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা নিজেরাই রাস্তায় নেমে প্রচারপত্র ও আমন্ত্রণপত্র বিলি করেন। গণপরিবহনের বাসে যাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেন তারা, অনুরোধ করেন সিনেমাটি দেখার জন্য।
শুরুতে এমন প্রচেষ্টার ফল কতটা মিলবে, তা নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া আসতে থাকে। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ছড়িয়ে পড়ে সিনেমাটির খবর। বাড়তে থাকে দর্শক, প্রদর্শনী এবং আয়ও।
বড় প্রচার আয়োজনের পরিবর্তে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের এই উদ্যোগই সিনেমাটির সাফল্যের অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে।
গ্রামীণ জীবনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘প্রেমাদা ওরালি’র গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন কৃষক নাগান্না ও তার ছেলে শান্তু। স্ত্রীকে হারানোর পর একাই ছেলেকে বড় করেন নাগান্না। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। শান্তু যেন শিক্ষিত ও উপযুক্ত একজন নারীকে বিয়ে করে, সেটিই চান তিনি। কিন্তু শান্তুর প্রতি দুর্বলতা রয়েছে তাদের আত্মীয় বসন্তার।
বাবার পছন্দে রুক্মিণীকে বিয়ে করে শান্তু। এরপর তার দাম্পত্যজীবনে দেখা দেয় নানা জটিলতা। পারিবারিক প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত অনুভূতি, ভালোবাসা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় কাহিনি।
পরিচালক মনোজ কুমার গ্রামীণ সমাজের পরিচিত বাস্তবতার সঙ্গে প্রেম ও পারিবারিক সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেছেন সিনেমাটিতে। গল্পের এই আবেগনির্ভর উপস্থাপন দর্শকদের সঙ্গে ছবিটির সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিনেমাটিতে নাগান্না চরিত্রে অভিনয় করেছেন রঙ্গায়না রঘু। শান্তু চরিত্রে রয়েছেন শ্রী রাম, রুক্মিণী চরিত্রে তাপস্বিনী পুনাচ্চা এবং বসন্তা চরিত্রে রামিকা শিবু।
কন্নড় চলচ্চিত্রশিল্পে ‘প্রেমাদা ওরালি’র সাফল্য নজর কেড়েছে পরিচিত তারকাদেরও। ‘কেজিএফ’ সিনেমার তারকা যশ এবং ‘কান্তারা’র অভিনেতা ও পরিচালক ঋষভ শেঠি গল্পনির্ভর সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর জন্য দর্শকদের প্রশংসা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বড় বাজেটের সিনেমার বাণিজ্যিক সাফল্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ‘প্রেমাদা ওরালি’র এই অর্জন আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, সিনেমাটির সাফল্য দেখিয়েছে, দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে শুধু বড় তারকা কিংবা বিপুল প্রচারই সব সময় যথেষ্ট নয়; গল্প ও দর্শকের সঙ্গে আবেগের সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালে কর্ণাটকের বক্স অফিসে সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমাগুলোর তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার দৌড়েও রয়েছে ‘প্রেমাদা ওরালি’। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজ্যটিতে রণবীর সিং অভিনীত ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’-এর আয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ছবিটির।
তবে বছরের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা হিসেবে এর অবস্থান নিশ্চিত করতে আরও যাচাই করা বক্স অফিসের হিসাব প্রয়োজন। পাশাপাশি অন্য সিনেমাগুলোর চূড়ান্ত আয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি- বিশ্বজুড়ে ১১৪ কোটি রুপি আয়ের অর্থ এই নয় যে পুরো অর্থ নির্মাতাদের হাতে এসেছে। প্রেক্ষাগৃহের অংশ, পরিবেশনা খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর নির্মাতাদের প্রকৃত প্রাপ্তি অনেক কম হয়। বক্স অফিসের মোট আয় ও নির্মাতাদের মুনাফা এক বিষয় নয়।
তারপরও সীমিত প্রদর্শনী, স্বল্প বাজেট এবং প্রচারের নানা বাধা পেরিয়ে ‘প্রেমাদা ওরালি’র এই সাফল্য কন্নড় সিনেমার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। প্রথম দিনের হতাশাজনক আয় থেকে শতকোটি রুপির মাইলফলকে পৌঁছানোর এই যাত্রা প্রমাণ করে, দর্শকের ইতিবাচক সাড়া একটি সিনেমার ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
সূত্র: নিউজ কর্ণাটক, পিংকভিলা।