logo

ইতিহাসসেরা কিছু ইরানি সিনেমা

ইতিহাসসেরা কিছু ইরানি সিনেমা

বিশ্ব চলচ্চিত্রে ইরানি সিনেমার আবেদন একটু অন্যরকম। যেখানে বলিউড-হলিউড সিনেমায় মারদাঙ্গা অ্যাকশন, উন্নত প্রযুক্তি ও রোমান্সের প্রাধান্য থাকে, সেখানে ইরানি সিনেমার পরতে পরতে মিশে থাকে মানবিক গল্প। মানবিক এসব গল্পের পাশাপাশি বাস্তববাদ এবং শৈল্পিক মানের জন্য ইরানি সিনেমা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ইরানি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি উপহার দিয়েছে আসগর ফরহাদি, মাজিদ মাজিদি, আব্বাস কিয়ারোস্তামির মতো স্বনামধন্য পরিচালক। তাদের নির্মিত সিনেমাগুলো অস্কারসহ বিশ্বজুড়ে অজস্র পুরস্কার জিতেছে। খুব সাধারণ গল্পকে অসাধারণভাবে পর্দায় তুলে ধরে ইরানি মুভি। সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক সম্পর্ক ও জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান দর্শক। অনেকের মতে, এসব সিনেমা শুধু বিনোদনের জন্যই নয়; বরং জীবনকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শেখায়। ইরানের কয়েকটি জনপ্রিয় সিনেমা নিয়ে এবারের আয়োজন।

চিলড্রেন অব হেভেন


একটি সিনেমা কীভাবে মানুষের আবেগকে নাড়িয়ে দিতে পারে, সেটি আসলে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মাজিদ মাজিদি পরিচালিত ‘চিলড্রেন অব হেভেন’ শুধু একটি সিনেমাই নয়, এর পরতে পরতে মিশে আছে পারিবারিক বন্ধন আর দায়িত্ববোধের গল্প। আলি ও তার ছোট বোন জোহরা আর এক জোড়া জুতা নিয়েই গল্প। বোনের জুতা হারিয়ে গেলে তারা সিদ্ধান্ত নেয়, একই জুতা ভাগ করে পরে স্কুলে যাওয়ার। সকালে বোন পরে স্কুলে যায়, আর বাসায় এলে সেই জুতা পরে স্কুলে ভাই। এভাবেই দারিদ্র্য, সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ, ভাইবোনের গভীর ভালোবাসা আর স্বপ্ন নিয়ে সাজানো ‘চিলড্রেন অব হেভেন’। সিনেমাটি ১৯৯৯ সালে সেরা বিদেশি হিসেবে অস্কারে মনোনীত হয়। এটিই অস্কারে মনোনীত প্রথম ইরানি চলচ্চিত্র।


সেভেনটি থার্টি

বাহরাম আফশারির সামাজিক কমেডি ‘সেভেনটি থার্টি’
ইরানি সিনেমার সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা ‘সেভেনটি থার্টি’। বাহরাম আফশারি পরিচালিত সামাজিক কমেডি সিনেমাটি ২০১৪ সালে মুক্তি পায়। ইয়াঘুব নামে এক ব্যক্তি লটারি জিতলে তার বন্ধু বারাত ও পারভেজ সেই টাকার একটা অংশ ভাগ হিসেবে দাবি করে। কিন্তু চিকিৎসক জানান, ইয়াঘুব শিগগির মারা যাবে। ফলে বারাত ও পারভেজের পরিকল্পনাকে জটিল করে তোলে। কীভাবে সেই টাকা পাওয়া যাবে, আর ইয়াঘুবেরই বা কী হবে? এভাবেই গড়ে ওঠে সিনেমাটির কাহিনি। কমেডি ও থ্রিলারের মিশেলের সিনেমাটি ৩৬০ কোটি টাকা আয় করে সর্বোচ্চ আয় করা ইরানি সিনেমা হয়ে ওঠে।

অ্যা সেপারেশন

নারী-পুরুষের সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প দেখা যায় এ সিনেমায়
‘অ্যা সেপারেশন’ দুজন নারী-পুরুষের সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্পই নয়, এই গল্পের গভীরে লুকিয়ে মনুষ্যত্বের এক গভীর অনুভূতি। চলচ্চিত্রকার আসগর ফরহাদি সমাজ বাস্তবতা, ঐতিহ্য ও জীবনবোধের এক অদ্ভুত মিশেলে তৈরি করেছেন সিনেমাটি। উন্নত জীবন যাপনের জন্য বিদেশ যাওয়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের অবনতি এক অভাবনীয় মেলো ড্রামা তৈরি করে। মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে সিনেমাটি পারিবারিক জীবনের কিছু কঠিন বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। ভালো ও খারাপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান, অনুভূতি, বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ ‘অ্যা সেপারেশন’। শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার সিনেমা হিসেবে ২০১২ সালে অস্কার পায়। এ ছাড়া এটি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড ও এশিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। 

দ্য কালার অব প্যারাডাইস

মাজিদ মাজিদির মাস্টারপিস ‘দ্য কালার অব প্যারাডাইস’
এক অন্ধ শিশুর জীবন ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার গভীর বিশ্বাসকে সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে সিনেমায় তুলে এনেছেন মাজিদ মাজিদি। মাজিদির আরেকটি মাস্টারপিস ‘দ্য কালার অব প্যারাডাইস’। এতে অন্ধ ছেলেটির সঙ্গে তার বাবার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনও দেখা যায়। জন্মান্ধ মোহাম্মদের বাবা ছেলেকে সমাজের বোঝা মনে করেন। কিন্তু সে নিজের মতো করে পাখির গান, ঝরনার শব্দ, ফুলের গন্ধ নিয়ে পৃথিবীকে অনুভব করে। প্রখর ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রকৃতির ছোট ছোট অনেক কিছুই অনুভব করতে পারে ছেলেটি। গ্রামীণ ইরানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে সিনেমায়। সব মিলিয়ে সিনেমাটি যে কোনো বয়সী দর্শকের মন ছুঁয়ে যাবে।   

দ্য হোয়াইট বেলুন

চিলড্রেন’স ড্রামা সিনেমা ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’-এর একটি দৃশ্য
নববর্ষের আগে রাজিয়ার একমাত্র চাওয়া সোনালি মাছ কেনা। মা তাকে মাছ কেনার জন্য টাকা দেয়। দুর্ভাগ্য তার, পথে টাকা হারিয়ে ফেলে। রাজিয়া সেই টাকার সন্ধানে বের হয় তেহরানের ব্যস্ত রাস্তায়। দেখা হয় সব বিচিত্র মানুষের সঙ্গে। এমন মানুষেরও দেখা পায়, যাদের জীবন তার চেয়েও জটিল। এমনই এক আবেগি কাহিনি নিয়ে নির্মিত ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’। আব্বাস কিয়ারোস্তামির চিত্রনাট্যে চিলড্রেন’স ড্রামা সিনেমাটি পরিচালনা করেন জাফর পানহি। কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালসহ বেশ কিছু পুরস্কার পায় বাস্তবতা ও শিল্পের অপূর্ব মিশ্রণে নির্মিত এই সিনেমা। 

হয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস

সাধারণ কাহিনিতে অসাধারণ একটি সিনেমা
আব্বাস কিয়ারোস্তামির আরেকটি ক্ল্যাসিক মুভি ‘হয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস’। ছোট্ট আহমেদ ও তার বন্ধু রেজার গল্প নিয়েই এই সিনেমা। অসাবধানতাবশত রেজার হোমওয়ার্কের খাতা নিজের ব্যাগে চলে আসে। মা-বাবার স্বাক্ষর ছাড়া খাতা জমা দিলে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। তাই শুরু হয় আহমেদের দুঃসাহসিক অভিযান। বন্ধুর বাড়ি কোথায় জানে না; জানে শুধু পাশের গ্রামেই। ছোট আহমেদ গ্রামের পথে ঘুরতে ঘুরতে এক নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। সাধারণ কাহিনি মনে হলেও অসাধারণ একটি সিনেমা এই চিলড্রেন ড্রামাটি। দায়িত্ববোধের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবিতে নির্মিত ‘হয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস’ বেশ কয়েকটি পুরস্কারে ভূষিত হয়।  

দ্য সেলসম্যান

সেরা চিত্রনাট্য ও সেরা অভিনেতার পুরস্কার পায় সিনেমাটি
‘দ্য সেলসম্যান’ আসগর ফারহাদির আরেকটি অস্কারজয়ী ইরানি ড্রামা-থ্রিলার, যেখানে উঠে আসে এক দম্পতির ট্রমা ও প্রতিশোধের গল্প। সিনেমাটি সম্পর্কের ভাঙন, সামাজিক বাস্তবতা এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন নিয়ে তৈরি। তেহরানের দম্পতি ইমাদ ও রানা পুরোনো অ্যাপার্টমেন্ট ধসে পড়ার পর নতুন জায়গায় আবাসন গাড়ে। সেখানে এক অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয় স্ত্রী। ঘটনাটি তাদের দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। সিনেমাটি নৈতিক দ্বিধা এবং আধুনিক ইরানের মধ্যবিত্ত জীবনের ওপর আলোকপাত করে। ২০১৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্য ও সেরা অভিনেতার পুরস্কার পায় সিনেমাটি। এ ছাড়া সেরা বিদেশি সিনেমা বিভাগে অস্কার পায়।