চাক নরিস, গল্পটি ফুরোলো!

নায়ক কিংবা মূল চরিত্র লড়াই করছেন দেশের প্রবল কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে, তখন অন্য দেশগুলো হয়ে উঠছে খলসদৃশ—বড়পর্দায়; বিশেষ করে অ্যাকশন সিনেমায় এমন গল্প সেই কবে থেকে চলছে! বহুল ব্যবহৃত সেই গল্পকেই নতুনভাবে নিজের মতো করে উপস্থাপনের মুনশিয়ানা দেখিয়ে বিখ্যাতও হয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গল্প ছাপিয়ে নিজেই হয়ে উঠেছেন ‘লার্জার দ্যান লাইফ’। উদাহরণ টানতে গেলে প্রথমেই যাদের নাম আসবে চাক নরিস তাদের মধ্যে অন্যতম। শুক্রবার (২০ মার্চ) মৃত্যু হয়েছে হলিউডের জনপ্রিয় এই অ্যাকশন তারকার।
দক্ষ অভিনয়ের জন্য নয়, বরং মার্শাল আর্ট আর স্টান্টবাজির মিশেলে দুর্ধর্ষ অ্যাকশনের ঝলক দেখিয়ে নিজের সময়ের সেরাদের কাতারে উঠে আসা চাক নরিসের। এরপর হঠাৎ বদলে যায় তাকে নিয়ে আলোচনার উপলক্ষ। আশি-নব্বই দশকের ভিডিও ক্যাসেট যুগের এই তারকা ইন্টারনেটের যুগে ভিন্নভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তাকে নিয়ে বানানো ‘চাক নরিস ফ্যাক্টস’ ওয়েবসাইটের হাস্যকর সব কনটেন্টের সুবাদে। আজগুবি আর উদ্ভট সব ‘বাণী’, তবে চাকের সঙ্গে ‘যায়’ বলেই হয়তো এতোটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠা। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন, হাসি গ্যারান্টেড!
ওই ওয়েবসাইটের প্যারোডি কনটেন্টগুলোর মধ্যে একটা ‘ফ্যাক্ট’ চাকের নিজেরও খুব পছন্দের ছিল—চাক নরিস মৃত্যুকে ধোঁকা দেন না, বরং তাকে আরামসে হারিয়ে দেন। চাক নরিসের মতো অজেয় যোদ্ধার পক্ষে অসম্ভব কিইবা হতে পারে!
যত রকম ফ্যাক্টের দমফাটানো হাসির গল্পই থাকুক, মারকুটে আর পেশিবহুল শরীরের মার্শাল আর্ট এক্সপার্ট অভিনেতা চাক নরিস বিদায় নিয়েছেন নিতান্ত এক সাধারণ মানুষের মতোই। বোমা গুলি কামানের গোলাবারুদ মিসাইল তাকে কাবু করতে আসেনি। আপনজনের কাছে ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পর্দায় অজেয় এই ব্যক্তিটি তাদের জন্য ‘নিবেদিতপ্রাণ স্বামী, স্নেহশীল পিতা’। এক সময় মানুষের মুখে মুখে নাম ফেরা এই অভিনেতার জীবনে পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া এমন স্বীকৃতির চেয়ে বড় ফ্যাক্ট সম্ভবত আর কিছু হতে পারে না। কারণ অনেক বিখ্যাত মানুষই তো এই স্বীকৃতিটুকু পর্দার বাইরের জীবনে অর্জন করতে পারেন না। চাক নরিস সেটাও পেরেছেন।
অবশ্য চাক নরিস একটা নির্দিষ্ট ঘরানার অভিনেতা হয়ে ক্যারিয়ার পার করেছেন। সেই ঘরানায় স্টিভেন সেগাল, জঁ ক্লদ ভ্যান ড্যাম, আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারও ছিলেন কমবেশি। চাক সেভাবে নায়ক যতটা ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গল্পে প্রয়োজন মেটানো ক্যারেক্টার ছিলেন। ব্রুস লির ‘দ্য ওয়ে অব দ্য ড্রাগন’ সিনেমায় নরিসের সেই লড়াই বাংলাদেশে আশি-নব্বইয়ের দশকে ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া করে সবাই মিলে সিনেমা দেখা প্রজন্মের এখনও মনে থাকার কথা। ক্ল্যাসিক ফাইট শেষে ব্রুস লির কাছে চাকের পরাজয়। ইন্টারনেটে চাইলে এখন এ দৃশ্য দেখা যায় যখন তখন। কিন্তু ওই সময়ে সিনেমার এই অংশটুকু দেখার জন্য সবার কত যে অপেক্ষা।
তারপর আরও কত কত সিনেমা—গুড গাইজ ওয়্যার ব্ল্যাক, ডেল্টা ফোর্স, ওয়াকার: টেক্সাস রেঞ্জার, মিসিং ইন অ্যাকশন, হেলবাউন্ড থেকে এ যুগের দ্য এক্সপ্যান্ডেবলস-২। শেষের সিনেমায় চাক নরিসের চরিত্রটি বেশ ছোটখাটো হলেও ভোলামতো নয়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চাক নরিস বলতে গেলে সব সময়েই প্রেসিডেন্টের পক্ষে, প্রকট মার্কিনি মতবাদের সঙ্গে কাঁধ জুটিয়ে লড়াই করে গেছেন। সে কমিউনিজম হোক, আমেরিকার মন্দ চাওয়া তাবৎ দুষ্টু দেশ হোক, ভিয়েতনামের যুদ্ধে নিষ্ঠুর জংলি ভিয়েতনামি সেনার খপ্পরে আটকে পড়া দেশপ্রেমী মার্কিনি সেনাকে উদ্ধারের ঘটনাই হোক—প্রবল আমেরিকান ভাবধারায় অটল থেকে বাকি সবাইকে ঠ্যাঙানোর জন্য চাক ছিলেন সদা প্রস্তুত। যে চাক নরিসের শত্রু, সে দেশেরও (পড়ুন আমেরিকা) শত্রু, শিশু-কিশোরদেরও (সে সময়ের) শত্রু হয়ে যেত।
এরপর সিনেমায় বড় বড় প্রযুক্তি আর চোখ ধাঁধানো অ্যাকশনের আমদানি ঘটে। খাঁটি মার্শাল আর্ট, শরীর লড়িয়ে দেওয়া অ্যাকশন আর মারপিটের দৃশ্য বদলে গেল প্রযুক্তির ঝলকে। চাক নরিসও তখন থেকেই একটু একটু করে ম্লান হতে থাকেন। তার পর্দার ‘নেমেসিস’ ব্রুস লি তো বিদায় নিয়েছেন বহু আগেই।
২০০০ সালের পরপর হঠাৎ প্যারোডি ওয়েবসাইট ‘চাক নরিস ফ্যাক্টস’ নতুন প্রজন্মের আগ্রহে তুলে আনে চাক নরিসকে। হাসির পাল্লায় সেটি এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে এর অনুকরণে আরও অনেক তারকাকে নিয়ে বিভিন্ন দেশে ফ্যাক্টস বানানোর ছড়াছড়ি পড়ে যায়। মূলত, কোনো নির্দিষ্ট আচরণ বা স্টেরিওটাইপে আটকানো তারকারাই হয়ে ওঠেন এই ‘ফ্যাক্ট’ এর ক্যারেক্টার।
যেমন বলিউডের পারিবারিক আদর্শ, নিয়মনীতি, পিতা-মাতা-সন্তান ভক্তি, প্রবল ধর্মপরায়ণতায় আটকানো অভিনেতা অলোক নাথকে নিয়ে বলা একটা ফ্যাক্ট— অলোক নাথ ‘টেম্পল রান’ গেম খেলার সময় পা থেকে জুতা খুলে রাখেন।
কিংবা দক্ষিণের তারকা রজনীকান্তকে নিয়ে বলা ফ্যাক্ট—রজনীকান্ত পেঁয়াজকে কাঁদাতে পারেন, রজনীকান্তের ঘড়ি লাগে না কারণ তিনিই ঠিক করেন এখন কয়টা বাজবে!

চাক নরিসের ফ্যাক্টগুলো পর্দায় তার যে কঠোর অজেয় ইমেজ, সেখান থেকে হয়তো বেশি মজাদার। তবে কিছু কিছু ফ্যাক্টসের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত বোঝাপড়া করতে গেলে আলোচনা অন্যদিকে যেতে পারে। ‘হজমের জন্য বুক জ্বালাপোড়া করলে চাক নরিস নাপাম (ভিয়েতনামে ব্যবহৃত কুখ্যাত বোমা) পান করেন’—এই ঠাট্টার মতো সে যুগে কতটা সরলীকৃত কাহিনি আর প্রোপাগান্ডায় ভর করে সিনেমা তৈরি হতো, সেসব ভাবলে আলোচনা হয়তো আরও জটিল হবে। চাক নরিস যার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সেটা আসলে ঠিক না বেঠিক—এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তখনকার তরুণ দর্শকদের মাথা ঘামানো লাগেনি। আর এখনকার সময়ে তিনি প্রাসঙ্গিক মজাদার ‘ফ্যাক্টস’ সহকারে।
ব্যক্তিজীবনে চাক নরিস নিষ্ঠা, মার্শাল আর্টের প্রতি দায়বদ্ধতা, বিভিন্ন দাতব্য কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে বুঝিয়েছেন; বড়পর্দার স্টেরিওটাইপ ছাপিয়ে নিজের আদর্শের একজন সংগ্রামী যোদ্ধা তিনি হতে পেরেছিলেন। নরিসের একসময়ের সহ-অভিনেতা, বন্ধু ‘টার্মিনেটর’ তারকা আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, ‘হলিউড আর বাস্তব জীবন, সবখানেই চাক ব্যাড্যাস (পড়ুন দুর্দান্ত) ছিল।’ আরেক অ্যাকশন মাস্টার ‘র্যাম্বো’ সিলভেস্টার স্ট্যালোন বলেছেন, ‘চাক নরিস সব দিক দিয়েই একজন খাঁটি আমেরিকান ছিল।’
চাক নরিসের বিদায় আমাদের দেশের, কিংবা পৃথিবীজুড়ে আশি-নব্বই দশকের তরুণ প্রজন্মের জন্যও এক স্মৃতিকে বিদায় জানানো। তাদেরও তো অনেকটা সময় চলে গেছে কী না!