logo

শ্রেণিকক্ষ থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘সেনসেশন’, কে এই মোমিন

শ্রেণিকক্ষ থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘সেনসেশন’, কে এই মোমিন

নিজের বাড়িঘর ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি জমান ৭০ বছরের বিয়ানা ওয়াত্রে মোমিন। অবসরপ্রাপ্ত এই কলেজ শিক্ষিকা উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ে শান্ত পরিবেশে পারিবারিক জীবন কাটাচ্ছিলেন। চারটি কুকুরের যত্ন নেওয়া আর নাতি-নাতনিদের সঙ্গে হেসে-খেলে সময় কাটত তার। সেখান থেকে তিনি তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে কেরালায় যান একটি সিনেমায় অভিনয় করতে।

তিনি যে ভাষা বুঝতেন না, সেই ভাষায় অভিনয় করতে হয়েছে তাকে। চরিত্রের গভীরতা ও অর্থ শুটিং শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন। অর্থাৎ কাজ করতে করতেই চরিত্রের গুরুত্ব পরিষ্কার হয়েছে তার কাছে। সিনেমাটির নাম ‘ইকো’, যা মালয়ালাম ভাষায় নির্মিত। এ একটি সিনেমাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

একটি সিনেমায় অভিনয় করেই প্রশংসা কুড়িয়েছেন মোমেন। এমনকি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘পঞ্চইন্দ্রিয়’ হিসেবেও বিবেচনায় রয়েছেন। যদিও মেঘালয়ের  গারো আদিবাসী মোমিনের জীবনে অভিনয় কখনোই লক্ষ্য ছিল না। এমনকি এ বিষয়ে তার কৌতূহলও ছিল না।

গত বছরের ২১ নভেম্বর প্রথম থিয়েটারে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এরপর ৩১ ডিসেম্বর নেটফ্লিক্সে আসে ‘ইকো’। মাত্র ৪৫ দিনের স্বল্প বাজেটে তৈরি করা সিনেমাটি নেটফ্লিক্সে প্রদর্শনের পর বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। সিনেমাটি ঘিরে আগ্রহের বড় কারণ মোমিনের অভিনয়। অর্থাৎ এর নীরব শক্তি আর পটভূমি।

বিবিসিকে মোমিন বলেন, ‘ছোটবেলায় আমাদের শহরে সিনেমা হল বা থিয়েটার ছিল না।’ অভিনয়ের কোনো প্রশিক্ষণও তার ছিল না। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘শুধু শ্রেণিকক্ষে পড়ানোকে যদি অভিনয় ধরা হয়, তাহলে আলাদা কথা।’

তুরু সরকারি কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মোমিন রোমান্টিক কবিতা ভালোবাসতেন। কখনো ভাবেননি, একদিন তার দিকে ক্যামেরা তাক করা থাকবে। কিন্তু ‘ইকো’ তার জীবনে এসে এক অপ্রত্যাশিত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এনে দেয়।

তিনি বলেন, প্রথম দিকে আমি দ্বিধান্বিত ছিলাম। একদম অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না, তার ওপর এতদূরে যেতে হবে; এসব ভেবেই চিন্তায় পড়েছিলাম।’ তবে তার মেয়ে তাকে সাহস জুগিয়েছেন। বলেছেন, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো, নতুন কিছু করে দেখো।’

‘ইকো’ সিনেমায় মোমিন অভিনয় করেছেন মালাথি চেট্টাথি চরিত্রে। পশ্চিমঘাট পবর্তমালার (ভারতের পশ্চিম উপকূল বরাবর একটি পবর্তমালা, যা ঘন বন ও কুয়াশাচ্ছন্ন) এক পাহাড়ি এলাকায় একা বসবাস করা এক রহস্যময় বৃদ্ধা এই চেট্টাথি। সিনেমার মূল চরিত্র হিসেবে তার উপস্থিতিই ছবির আবহ ও গল্পকে ধরে রাখে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বছরের পর বছর তিনি পাহাড়ের ওপর একটি ভাঙা বাড়িতে একা থাকেন। চারপাশে বন্য কুকুর আর কুয়াশা। এদিকে বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার দাবি নিয়ে কিছু মানুষ তার জীবনের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করে।

সঠিক অভিনেত্রী খুঁজতে গিয়ে নির্মাতা দল উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জায়গা এমনকি সেখানে মোতায়েন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছেও খোঁজ নেয়। তখনই গারো লোককথা নিয়ে নির্মিত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিতে মোমিনের অভিনয়ের ছবি ও ভিডিও তাদের নজরে আসে।

মোমিন বলেন, ‘কাকতালীয়ভাবে প্রাণী নিয়ে করা একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি থেকেই আমি আবার প্রাণীদের সঙ্গে থাকা একটি চরিত্রে সুযোগ পেলাম।’ এক বৃষ্টির দিনে তিনি ছেলেকে নিয়ে অডিশনের জন্য পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে যান।

মোমিন বলেন, ‘একজন আদিবাসী মানুষ হিসেবে এই বয়সে আমার ওপর ভরসা রাখার মতো সৃজনশীল মানুষদের পেয়ে আমি গর্বিত। আশা করি, এতে আরও প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হবে।’

প্রতিদিন পাহাড়ে ওঠা, অনিশ্চিত আবহাওয়া, ভারী যন্ত্রপাতি আর বৃষ্টি নামার আগেই শুট শেষ করার তাড়া—সবকিছুর মধ্যেই কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শক্ত মনের মানুষ। আবহাওয়া খারাপ হলেও অসুস্থ হইনি। কেরালার খাবারও সাহস করে চেখে দেখেছি।’

মোমিনের কাছে এই শুটিং ছিল শেখার অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করেই আমি আবার ছাত্র হয়ে গেলাম।’ ভাষা প্রশিক্ষকের সাহায্যে তিনি ধ্বনিগতভাবে মালয়ালাম সংলাপ শিখেছিলেন। পরে যদিও তার কণ্ঠ অন্য একজন দিয়েছেন, শুটিংয়ের সময় তিনি নিজেই সংলাপ বলতেন।

তার সহকর্মীরা বলেন, আবেগ, ক্যামেরার কোণ আর চলাফেরা সম্পর্কে তার ধারণা ছিল খুব স্পষ্ট। মোমিন বলেন, জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এসব পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মাতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকে এসেছি, কেরালার মতোই। আমার নারীবাদী চেতনা চরিত্রটিকে বুঝতে সাহায্য করেছে।’

ছবির চিত্রনাট্যকার ও চিত্রগ্রাহক বাহুল রমেশ বলেন, ‘আমরা তাকে কল্পিত একটি স্ক্রিপ্ট দিয়েছিলাম, যাতে পুলিশের কাছে নিখোঁজ ছেলের খবর দিতে যাচ্ছেন। তার স্বাভাবিকতা, সংযত আবেগ আর আত্মবিশ্বাস আমাদের মুগ্ধ করেছিল। ৭০ বছর বয়সে এত দূরে গিয়ে নতুন কিছু করার সাহসই আমাদের তাকে বেছে নিতে রাজি করায়।’

‘ইকো’কে অনেকেই পরিবেশ-রহস্য বা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার বলেন। তবে সিনেমাটি সহজে কোনো ছকে ফেলা যায় না। ঠিক যেমন মালাথি চেট্টাথি চরিত্রটিও নয়। তিনি কোনো অলংকার বা রহস্যময় ক্লিশে চরিত্র নন; বরং নীরব অথচ দৃঢ় এক উপস্থিতি।

রমেশ তার অভিনয়কে ‘স্বাভাবিক ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘৭০ বছর বয়সে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সাহসটাই ছিল অসাধারণ।’ 

রমেশ বলেন, ‘এই চরিত্রটি আত্মনির্ভরশীল এক নারী, যে নীরব দৃঢ়তায় তাকে ব্যবহার করতে চাওয়া মানুষদের হার মানায়। মোমিন খুব সহজেই এই নারীকেন্দ্রিক লোককথার চরিত্রে ঢুকে পড়েছিলেন।’ তার অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত তামিল অভিনেতা ধানুশও। তিনি মোমিনের কাজকে ‘বিশ্বমানের অভিনয়’ বলেছেন।

পরিচালক দিনজিথ আয়্যাথান এমন এক নতুন মুখ খুঁজছিলেন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি আগ্রাসনের পর মালয়েশিয়া থেকে পালিয়ে কেরালায় আসা এক বৃদ্ধা মালয় নারীর চরিত্রে অভিনয় করতে পারবেন।

‘ইকো’ সফল হওয়ার পর বলিউডসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে তার কাছে কাজের প্রস্তাব এসেছে। মোমিন বলেন, ‘আলোচনা চলছে। অভিনয় কঠিন কাজ। দেখা যাক সামনে কী আসে।’ এখন আপাতত তিনি বাড়িতে ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন এবং বই পড়ার ক্লাবে যুক্ত আছেন। হাসিমুখে বলেন, ‘এই সপ্তাহে আমরা অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ বইটি নিয়ে আলোচনা করব।’