বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় কিছু তুর্কি সিনেমা

সিনেমার ভুবনে এক আবেগের নাম, এক চাওয়ার নাম তুর্কি সিনেমা। এসব সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, এগুলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির এক অপূর্ব সেতুবন্ধন। অ্যাকশন বা থ্রিলারের চেয়ে মানবিক সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং পারিবারিক টানাপোড়েন ফুটে ওঠে তুরস্কের এসব সিনেমায়। আর এসব সামাজিক প্রেক্ষাপট বেশি গুরুত্ব পায় বলেই বিশ্বমানের মর্যাদা পেয়েছে তুর্কি সিনেমা। আধুনিক তুর্কি সিনেমাগুলো তাদের সিনেমাটোগ্রাফি এবং সংগীতের জন্য প্রশংসিত ও জনপ্রিয়। তুরস্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধীরগতির দৃশ্যকাব্য এবং দার্শনিক গভীরতায় নির্মিত এসব সিনেমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের নাম উজ্জ্বল করেছে। বর্তমান সময়ের ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তার নিরিখে কয়েকটি তুর্কি সিনেমা নিয়ে এবারের আয়োজন।
১. ‘মিরাকল ইন সেল নং সেভেন’

এটি শুধু সিনেমা নয়, চোখের কোণে জল আনা এক অসামান্য মহাকাব্য। তুরস্কের সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে ‘মিরাকল ইন সেল নং সেভেন’ অনন্য ভূমিকা রাখে। মানসিকভাবে অসুস্থ এক বাবাকে ঘিরেই আবর্তিত সিনেমাটির গল্প। এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় একটি খুনের দায়ে ফাঁসির আদেশ হয় তার। কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে বাবার সরলতা এবং মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি কীভাবে অপরাধীদের হৃদয় গলিয়ে দেয়, তা নিয়েই সাজানো হয় গল্প। সিনেমাটি কেবল একটি অপরাধের গল্প নয়; বরং এটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং মানবিকতার এক গভীর দর্পণ। এক নিষ্পাপ হৃদয়ের লড়াইয়ের কাহিনিতে বাবার চরিত্রে আরাস বুলুত ইনেমলির অতিমানবীয় অভিনয় দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে।
২. ‘আয়লা: দ্য ডটার অব ওয়ার’

তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ার বন্ধুত্বের এক অনন্য নিদর্শন ‘আয়লা: দ্য ডটার অব ওয়ার’। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, রক্তপাত আর বিভীষিকা। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেও যে মানবিকতা ও ভালোবাসার ফুল ফুটতে পারে, তারই এক জীবন্ত দলিল ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তুর্কি সিনেমাটি। পঞ্চাশের দশকে কোরীয় যুদ্ধের সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি বিশ্বের তাবৎ সিনেপ্রেমীর হৃদয়ে নাড়া দেয়। তুর্কি সৈনিক সুলেমান কোরীয় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে খুঁজে পান ছোট্ট অনাথ কোরীয় মেয়েকে। নাম রাখেন আয়লা। ভাষাগত দূরত্ব থাকলেও তাদের মাঝে গড়ে ওঠে বাবা ও মেয়ের এক সুদৃঢ় বন্ধন। যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেও আয়লাকে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যকে সিক্ত করেছে।
৩, ‘উইন্টার স্লিপ’
তুর্কি সিনেমার কথা উঠলে যার নাম বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রে সবার আগে উচ্চারিত হয়, তিনি নুরি বিলগে চেইলান। আর তার পরিচালিত ‘উইন্টার স্লিপ’ সেলুলয়েডের পর্দায় খোদাই করা এক দার্শনিক মহাকাব্য। ২০১৪ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত হয়। সিনেমাটির পটভূমি মধ্য আনাতোলিয়ার সুন্দর কিন্তু রুক্ষ অঞ্চল ‘ক্যাপাডোকিয়া’। আয়দিন নামে এক অবসরপ্রাপ্ত অভিনেতা নিজেকে শিক্ষিত, দয়ালু ও আদর্শবান মনে করলেও তার ভেতরের সূক্ষ্ম নিষ্ঠুরতা উন্মোচিত হতে থাকে সিনেমার পরতে পরতে। সিনেমাটি মানুষের জীবন ও স্বভাবকে নতুন করে চেনাতে সাহায্য করে।
৪. ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন আনাতোলিয়া’

ধুলোমাখা প্রান্তরে সত্যের অন্তহীন খোঁজ পেতে দেখতে হবে ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন আনাতোলিয়া’। নুরি বিলগে চেইলানের হাত ধরে আসা আরও একটি বিস্ময়কর মাস্টারপিস। কান উৎসবে গ্র্যান্ড প্রিক্স জয়ী সিনেমাটি স্রেফ একটি অপরাধের তদন্ত নয়; বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা এবং তুর্কি সমাজের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক নিখুঁত দর্পণ। সিনেমার গল্পটি আবর্তিত হয় এক দীর্ঘ রাতকে ঘিরে। একদল মানুষ খুনিসহ জনমানবহীন পাহাড়ি প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় একটি লাশের সন্ধানে। সেই তল্লাশি ধীরে ধীরে মোড় নেয় এক দার্শনিক যাত্রায়। প্রতিটি স্টপেজ আর অন্তহীন গাড়ির চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে উন্মোচিত হতে থাকে সেখানে থাকা মানুষগুলোর ব্যক্তিগত হতাশা, একাকিত্ব এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব।
৫. ‘ফেতিহ ১৪৫৩’

ইতিহাসের পাতার কিছু ঘটনা পুরো পৃথিবীর মানচিত্র এবং ভাগ্য বদলে দেয়। অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের কনস্টান্টিনোপল বিজয় তেমনই এক যুগান্তকারী ঘটনা। সেই বীরত্বগাথাকে সেলুলয়েডের পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছে ‘ফেতিহ ১৪৫৩’। তুর্কি জনগণের কাছে এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং তাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবের এক প্রতিচ্ছবি। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ঐতিহাসিক অ্যাকশন ড্রামাটিতে দেভরিম এভিনের অভিনয় ছিল অত্যন্ত তেজস্বী। যারা ঐতিহাসিক যুদ্ধ, রাজকীয় সাজসজ্জা এবং রোমাঞ্চকর সিনেমা পছন্দ করেন, তাদের জন্য ‘ফেতিহ ১৪৫৩’ একটি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র।