logo

ভেতরে একটা বিশ্বাস ছিল যে কোনো একসময় আবার সুযোগ পাব: বিদুষী বর্ণিতা

ভেতরে একটা বিশ্বাস ছিল যে কোনো একসময় আবার সুযোগ পাব: বিদুষী বর্ণিতা
অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা। ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতার ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে ওয়েব ফিল্ম ‘ক্যাফে আমব্রেলা’। শিহাব শাহীনের পরিচালনায় এতে তাকে একজন মডেল ও অভিনেত্রীর চরিত্রে পর্দায় হাজির হতে দেখা গেছে। ক্যাফে আমব্রেলায় নিজের চরিত্র, অভিনয়জীবন ও সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে তার সঙ্গে কথা হয়েছে এশিয়া পোস্টের।

অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা। ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে
অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা। ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

ছোটবেলায় শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু, এই জার্নি কেমন ছিল?

আমি খুব ছোটবেলা থেকেই কাজ শুরু করি। তখন বয়স সম্ভবত তিনের কাছাকাছি। প্রথমে বিজ্ঞাপন, এরপর ধীরে ধীরে নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজ করা। ছোটবেলায় আসলে কাজের জগৎ এতটা বুঝতাম না, আমার কাছে পুরো বিষয়টাই অনেকটা আনন্দের ছিল। বিভিন্ন গুণী পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এখন পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমার বর্তমান অভিনয় জীবনকে কতোটা সহযোগীতা করছে।

শিশুশিল্পী হিসেবে যাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা হয়...

অনেকগুলো কাজের কথাই মনে পড়ে। যেমন অমিতাভ রেজা চৌধুরীর পরিচালনায় ‘মায়েশা’তে কাজ করেছিলাম, যেখানে জয়া ম‍্যামের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ‘গেরিলা’তেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। এ ছাড়া তৌকীর আহমেদ, বিপাশা হায়াত, মাহফুজ আহমেদ, অনিমেষ আইচসহ অনেক গুণী মানুষের কাজের অংশ হতে পেরেছি। তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু এখন মনে হয় এত অল্প বয়সে এত মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারাটা সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল।

অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা।
অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা।

‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় আপনার ক্যারিয়ারে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে?

‘গেরিলা’ আমার কাছে অনেক স্পেশাল কাজ। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের অংশ হতে পারাটা আমার জন্য অনেক বড় অভিজ্ঞতা ছিল। যদিও আমার রোলটা অনেক ছোট ছিল, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর মতো একজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম যেটা অনেক বড় পাওয়া। তখন বয়স কম থাকায় বিষয়গুলোর গুরুত্ব হয়তো পুরোপুরি বুঝিনি, কিন্তু এখন এটা আমার অভিনয়জীবনের অন্যতম গর্বের জায়গা।

প্রায় ৮-৯ বছর অভিনয় থেকে দূরে থাকার কারণ?

আসলে বিরতিটা ইচ্ছাকৃত ছিল না। একটা সময়ের পর বয়স বাড়ার কারণে শিশুশিল্পী হিসেবে আর কাজের সুযোগ নিতে চাচ্ছিলাম না বা খুব একটা হচ্ছিল না। তখন নিয়মিত অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াটাও কঠিন হয়ে যায়। আমি চেষ্টা থামাইনি, বিভিন্ন জায়গায় অডিশন দিয়েছি। তবে অনেক সময় মনে হয়েছে, শুধু অভিনয়ের অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা থাকলেই হচ্ছে না, ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিতি এবং ফেস ভ্যালুও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকবার চেষ্টা করেও যখন সুযোগ হচ্ছিল না, তখন ধীরে ধীরে কাজের বাইরে চলে যাই। তবে অভিনয় থেকে দূরে ছিলাম, অভিনয়ের ইচ্ছা থেকে কখনোই না।

অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা।
অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা।

বিরতির পর অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছাটা কীভাবে ধরে রেখেছিলেন?

আমি ছোটবেলা থেকেই অভিনেত্রী হতে চেয়েছি। এটা আমার কাছে হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো ইচ্ছা নয়। এত বছর কাজ না করলেও সিনেমা দেখা, অভিনয় নিয়ে ভাবা, ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ, এসব কখনো বন্ধ হয়নি। মাঝে মাঝে হয়তো হতাশ হয়েছি, কিন্তু নিজের ভেতরে একটা বিশ্বাস ছিল যে কোনো একসময় আবার সুযোগ পাব। হয়তো সেই অপেক্ষাটাই আমাকে ইচ্ছাটা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

অডিশন দিয়েও সুযোগ না পাওয়ার সময়গুলো কীভাবে সামলেছেন?

সত্যি বলতে, সবসময় খুব সহজ ছিল না। অনেকবার অডিশন দিয়ে ফিরে এসেছি, অনেক সময় নিজের কাছেও প্রশ্ন এসেছে যে আসলে কোথায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে যখন দেখতাম আমার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অন্য পরিচিত মুখ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় কাউকে বেছে নেওয়া হচ্ছে, তখন খারাপ লাগত। তবে আমি এটাও বুঝেছি, একটা কাজের জন্য কাউকে নির্বাচন করার পেছনে অনেক রকম হিসাব থাকে। সব প্রত্যাখ্যান মানেই যে আমি ভালো নই, তা নয়। নিজের ওপর বিশ্বাসটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।

অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা।
অভিনেত্রী বিদুষী বর্ণিতা।

আপনি বলেছেন, শুধু অভিজ্ঞতা নয়, ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিতি ও ফেস ভ্যালুও প্রয়োজন—এটা কেন মনে হয়েছে?

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই কথাটা বলেছি। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন অনেক কাজ করেছি, পরিচিত পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু এত বছর পর যখন আবার অডিশন দিতে শুরু করলাম, তখন বুঝতে পারলাম, আগের অভিজ্ঞতাগুলো সবসময় আমাকে নতুন করে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। অনেক সময় একজন শিল্পীকে মানুষ আগে থেকে কতটা চেনে, তার একটা দর্শকগোষ্ঠী আছে কি না, সেগুলোও বিবেচনায় আসে। তাই আমার মনে হয়েছিল, এমন একটা বড় প্ল্যাটফর্ম দরকার যেটা আমাকে নতুন করে মানুষের সামনে পরিচিত করবে।

একজন শিল্পীর ক্যারিয়ারে ‘ফেস ভ্যালু’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?

আমার মনে হয়, ফেস ভ্যালু গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে এই সময়ে। কারণ একটা কাজের সঙ্গে দর্শকের প্রথম পরিচয় অনেক সময় শিল্পীর পরিচিত মুখের মাধ্যমেই হয়। তবে আমার কাছে ফেস ভ্যালু আর অভিনয়দক্ষতা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। পরিচিতি হয়তো একজন শিল্পীকে কাজের সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন টিকে থাকতে হলে কাজ দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত দর্শক কিন্তু অভিনয়টাই মনে রাখেন।

লাক্স সুপারস্টারে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ কী ছিল?

আমি আসলে এমন একটা প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিলাম, যেখান থেকে নিজেকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে পারব। অনেক বছর ধরে অভিনয়ে ফেরার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু সেই জায়গায় পৌঁছানোর জন্য একটা সুযোগ দরকার ছিল। লাক্স সুপারস্টার আমার কাছে শুধু একটা প্রতিযোগিতা ছিল না, এটা ছিল নিজের স্বপ্নের দিকে আবার এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

লাক্স সুপারস্টার আপনার ক্যারিয়ারে কী ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে?

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, অনেক বছর পর মানুষ আমাকে আবার চিনতে শুরু করেছেন। শুধু দর্শক নয়, ইন্ডাস্ট্রির অনেক মানুষের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, এখন আমার সামনে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং নিজের অভিনয়ের জায়গাটাকে আবার গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছি। তবে আমি মনে করি, এটা কেবল শুরু। লাক্স আমাকে একটা দরজা খুলে দিয়েছে, এখন সেই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করাটা আমার দায়িত্ব।

দীর্ঘ বিরতির কারণে অভিনয়ে ফেরার পর কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে?

অবশ্যই। কারণ ছোটবেলায় অভিনয় করা আর এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিল্পী হিসেবে কাজ করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। ছোটবেলায় নির্দেশনা অনুসরণ করে অভিনয় করতাম, কিন্তু এখন একটি চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, তার আচরণ, তার সিদ্ধান্ত, সবকিছু বুঝে অভিনয় করতে হয়। পাশাপাশি এত বছর ইন্ডাস্ট্রির বাইরে থাকার কারণে অনেক নতুন পরিবর্তনের সঙ্গেও পরিচিত হতে হয়েছে। তবে আমি এগুলোকে নেতিবাচকভাবে দেখছি না। বরং নতুন করে শেখার সুযোগ পাচ্ছি।

ওয়েব ফিল্ম ‘ক্যাফে আমব্রেলা’-তে বিদুষী বর্ণিতার বিপরীতে অভিনয় করেছেন তৌসিফ মাহবুব।
ওয়েব ফিল্ম ‘ক্যাফে আমব্রেলা’-তে বিদুষী বর্ণিতার বিপরীতে অভিনয় করেছেন তৌসিফ মাহবুব।

ক্যাফে আমব্রেলায় কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

ক্যাফে আমব্রেলা আমার জন্য খুবই বিশেষ একটি কাজ। প্রথমত, শিহাব শাহীন স‍্যারের মতো একজন পরিচালকের সঙ্গে ক্যারিয়ারের শুরুতেই কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর কাজের ধরন, গল্প বলার পদ্ধতি এবং সেটে পুরো টিমকে পরিচালনা করার বিষয়গুলো কাছ থেকে দেখা আমার জন্য অনেক বড় অভিজ্ঞতা। আরেকটা ভালো লাগার জায়গা ছিল, লাক্সের টপ থ্রিতে থাকা আমরা তিনজন, আমি, নাযাহ এবং আমিনা, আবার একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিযোগিতার সময় আমাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল, শুটিংয়ে সেটা আবার ফিরে পেয়েছি। তৌসিফ ভাইয়ের সঙ্গেও কাজ করে খুব ভালো লেগেছে। তিনি অনেক সহযোগিতাপরায়ণ এবং নিজের কাজের ব্যাপারে ভীষণ আন্তরিক। নতুন হিসেবে তাঁর কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। আর আমার চরিত্র সামিরা একজন অভিনেত্রী, যে নিজের পেশাগত জীবন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে একটা ভারসাম্য খুঁজে বেড়ায়। চরিত্রটির মধ্যে বেশ কিছু জটিলতা আছে, যেগুলো নিয়ে কাজ করতে আমার ভালো লেগেছে।

ক্যারিয়ারে কতটা প্রভাব ফেলবে?

আমি মনে করি, ক্যাফে আমব্রেলা আমার ক্যারিয়ারের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ শুরু। কারণ দীর্ঘ বিরতির পর এবার আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকদের সামনে এসেছি। এই কাজের মাধ্যমে দর্শক আমাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি শিহাব শাহীন স‍্যারের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ভবিষ্যতে আমাকে অনেক সাহায্য করবে বলে মনে করি। তবে আমি চাই না একটি কাজ দিয়েই নিজের পুরো ক্যারিয়ারকে বিচার করতে। সামনে আরও অনেক ভালো কাজ করতে চাই।