logo
Advertisement

সাদেক বাচ্চু : যে ভিলেনকে দর্শক সত্যিই ভয় পেত

সাদেক বাচ্চু : যে ভিলেনকে দর্শক সত্যিই ভয় পেত
সাদেক বাচ্চু। ছবি: অভিনেতার ছবির কোলাজ

একজন অভিনেতার অভিনয় কতটা জীবন্ত হলে পর্দার মানুষটিকেই দর্শকরা বাস্তবের মানুষ হিসেবে ভেবে বসেন? উত্তর খুঁজতে গেলে সাদেক বাচ্চুর গল্পটি সামনে আসে। পর্দায় তিনি যখন চরিত্রের প্রয়োজনে অন্যায় করতেন, দর্শকদের চোখে তিনি তখন সত্যিই অন্যায়কারী। যখন খুন করতেন, দর্শকরা সত্যিই তাকে খুনি ভাবত। আর যখন রাজাকারের চরিত্র করতেন, চরিত্রের প্রতি মানুষের ক্ষোভ গিয়ে পড়ত অভিনেতার ওপর। এমনকি একবার সেই ক্ষোভের প্রকাশ হয়েছিল পাথর আর বাদামের খোসায়।

একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে রাজাকারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সাদেক বাচ্চু। নাটকের একটি দৃশ্যে তার চরিত্র একজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পর্বটি প্রচারের পরদিন বোনকে আনতে ট্রেনে করে জামালপুর গিয়েছিলেন তিনি। স্টেশনে তাকে দেখে দর্শকদের কেউ বাদামের খোসা ছুড়ে মারেন, কেউ ছুড়েছিলেন পাথর। কোনোমতে সেখান থেকে সরে যেতে হয়েছিল অভিনেতাকে। দর্শকরা গুলিয়ে ফেলেছিলেন- ওটা তিনি নন, ওটা ছিল তাঁর অভিনীত চরিত্র। এটিই অভিনেতার অভিনয় জীবনের সফলতা।

এ ঘটনা নিছক মজার কোনো স্মৃতি নয়। বরং সাদেক বাচ্চুর অভিনয়ের শক্তি বোঝার জন্য এটি এক বিরল দলিল। একজন অভিনেতা চরিত্রকে কতটা নিজের মধ্যে ধারণ করলে দর্শক বাস্তব আর অভিনয়ের সীমারেখা ভুলে যেতে পারেন, সেই প্রশ্নের উত্তর যেন লুকিয়ে আছে ওই রেলস্টেশনের ঘটনায়।

আজ ১৪ সেপ্টেম্বর। ২০২০ সালের এই দিনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬৫ বছর বয়সে অভিনয় ও বাস্তব জগৎ ছেড়ে চলে যান সাদেক বাচ্চু। ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেমে যায় তাঁর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা।

আজ তাঁর ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবসে ফিরে তাকালে তাই শুধু একজন ‘ভিলেন’কে দেখা যায় না। দেখা যায় বাংলাদেশের বিনোদনজগতের এমন এক শিল্পীকে, যিনি বেতারের শব্দ থেকে মঞ্চের আলো, টেলিভিশনের পর্দা হয়ে চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দায় নিজের জন্য আলাদা একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন।

মাহবুব থেকে সাদেক বাচ্চু

সাদেক বাচ্চুর আসল নাম মাহবুব আহমেদ সাদেক। জন্ম ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে। তাঁর পৈতৃক শিকড়ও চাঁদপুরে। তবে কোথাও কোথাও তাঁর জন্মস্থান নিয়ে ঢাকার উল্লেখও পাওয়া যায়।

‘সাদেক বাচ্চু’ নামটি অবশ্য জন্মের সঙ্গে পাওয়া নয়। চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম ‘চাঁদনী’ ছবিতে অভিনয়ের সময় তাঁর নাম দেন ‘সাদেক বাচ্চু’। পরবর্তী সময়ে সেই নামই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়, আর আসল নামটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যে মানুষটি পরে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত খল অভিনেতা হয়ে উঠবেন, তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল মোটেও চলচ্চিত্রনির্ভর নয়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে চাকরিতে ঢুকেছিলেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ ডাক বিভাগে চাকরি করার পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান; টি অ্যান্ড টি নাইট কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০১৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নেন। কিন্তু চাকরি তাঁর শিল্পীসত্তাকে আটকে রাখতে পারেনি।

মাইক্রোফোন দিয়ে শুরু

সাদেক বাচ্চুর অভিনয়জীবনের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল সিনেমা দিয়ে নয়, বেতারে। ১৯৬৩ সালে ‘খেলাঘর’ নাটকের মাধ্যমে বেতারে অভিনয় শুরু করেন তিনি। তখন বয়স মাত্র আট বছর। প্রায় এক দশক বেতারে কাজ করার পর মঞ্চে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

সত্তরের দশকের শুরুতে তিনি যুক্ত হন ‘গণনাট্য পরিষদ’-এর সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যখন নতুন করে দল ও নাট্যচর্চার পরিসর তৈরি হচ্ছিল, তখনই তিনি নিজেকে মঞ্চের অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলতে থাকেন। পরে ‘উন্মোচন’ ও ‘প্রথম পদক্ষেপ’-এর মতো নাট্যদলের সঙ্গেও কাজ করেন।

শুধু অভিনয় নয়- নাটক রচনা ও নির্দেশনার প্রতিও ছিল তাঁর আগ্রহ। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মতিঝিল থিয়েটার’। এই দলের হয়ে আমৃত্যু অভিনয়, নির্দেশনা ও নাট্যরচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘কাফনের পকেট নাই’, ‘কুলাঙ্গার’ ও ‘ক্যাপ’-এর মতো নাটক তাঁর রচনা ও নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ পর্দার ‘ভিলেন’ পরিচয়ের অনেক আগে থেকেই তিনি ছিলেন একজন থিয়েটারকর্মী।

টেলিভিশনে সহস্রাধিক নাটক

মঞ্চের অভিজ্ঞতা তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে। ১৯৭৪ সালে প্রযোজক আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামের ‘প্রথম অঙ্গীকার’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে অভিষেক ঘটে তাঁর। ইমাম তাঁর মঞ্চ অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই সাদেক বাচ্চুর টেলিভিশনে আসার পথ তৈরি হয়েছিল বলে জীবনীভিত্তিক তথ্যসূত্রে উল্লেখ আছে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

‘ঝুমকা’, ‘পূর্ব রাত্রি পূর্বদিন’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘জোনাকী জ্বলে’, ‘গ্রন্থিক গণ কহে’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর টেলিভিশন নাটকের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বেতার ও টেলিভিশনে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও চলচ্চিত্রই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এনে দেয় সবচেয়ে বড় পরিচিতি।

নায়কে শুরু, খলনায়কে বাজিমাত

১৯৮৫ সালে শহীদুল আমিন পরিচালিত ‘রামের সুমতি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক সাদেক বাচ্চুর। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি নায়ক ও ইতিবাচক চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। এমনকি একটি চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করলেও সেটি মুক্তি পায়নি বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ আছে।

কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাস তাঁকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। খল চরিত্রে প্রথম দিকের কাজগুলোর পর এহতেশামের ‘চাঁদনী’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় মোড় তৈরি করে। সেখান থেকেই দর্শকের কাছে তাঁর ‘ভিলেন’ পরিচিতি পাকাপোক্ত হতে থাকে। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে নেতিবাচক চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- তিনি শুধু ‘খারাপ মানুষ’ হয়ে পর্দায় দাঁড়াতেন না; চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেন।

তাঁর চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠের স্বর, সংলাপ বলার ভঙ্গি কিংবা শরীরী ভাষা- সব মিলিয়ে তৈরি হতো এমন এক উপস্থিতি, যাকে উপেক্ষা করা কঠিন ছিল। তাই ‘ভিলেন’ শব্দটি তাঁর ক্ষেত্রে যেন ধীরে ধীরে একটি অভিনয়শৈলীর নাম হয়ে ওঠে।

পাঁচ শতাধিক ছবির পথচলা

পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে সাদেক বাচ্চু অভিনয় করেছেন পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে। আশির দশক থেকে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রজন্মের নায়ক-নায়িকার সঙ্গে পর্দা ভাগ করেছেন তিনি।

‘সুজন সখী’, ‘প্রিয়জন’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ‘বধূবরণ’, ‘আমার স্বপ্ন আমার সংসার’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’, ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘লাভ ম্যারেজ’, ‘রাজাবাবু-দ্য পাওয়ার’, ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি ২’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে।

এত বিপুল কাজের ভিড়ে তাঁকে কেবল খল অভিনেতা বললে তাঁর অভিনয়জীবনের পরিধি ছোট করে দেখা হয়। ইতিবাচক, পার্শ্ব ও কৌতুকধর্মী চরিত্রেও কাজ করেছেন তিনি। তবে দর্শকের স্মৃতিতে তাঁর সবচেয়ে গভীর ছাপ তৈরি হয়েছে নেতিবাচক চরিত্রেই।

পুরস্কার এল শেষ জীবনে

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের তুলনায় সাদেক বাচ্চুর পুরস্কারের তালিকা খুব বড় নয়। ২০১৫ সালে ‘লাভ ম্যারেজ’ চলচ্চিত্রের জন্য বাচসাস পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিটি আসে ক্যারিয়ারের শেষদিকে। ২০১৮ সালে ‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ খল অভিনেতার স্বীকৃতি পান।

এক অর্থে এটি ছিল দীর্ঘ অভিনয়জীবনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। পাঁচ দশক ধরে যে মানুষটি দর্শককে কখনো ভয় দেখিয়েছেন, কখনো বিরক্ত করেছেন, কখনো হাসিয়েছেন- শেষ পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে পরিচিত অভিনয় পরিচয়টিই এনে দেয় দেশের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বীকৃতি।

শিল্পীর ঘর, শিল্পীর মানুষ

ব্যক্তিজীবনেও সাদেক বাচ্চু ছিলেন পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ। স্ত্রী শাহনাজ জাহানের সঙ্গে তাঁর সংসারে ছিল দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী শাহনাজ জাহানের কথাতেও উঠে এসেছিল অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর টান। জীবনের শেষ সময়েও তিনি কাজ করতে চাইতেন। করোনা মহামারির সময়ে শুটিংয়ে যাওয়া নিয়ে পরিবার থেকে উদ্বেগ থাকলেও অভিনয় থেকে দূরে থাকতে পারেননি।

অভিনয়ের প্রতি এই টানটিই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্থায়ী পরিচয়। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে অবসর নেওয়ার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাঁর উত্তর ছিল- ‘অভিনয়শিল্পীর কোনো অবসর নেই।’ কথাটি যেন শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের জীবনকেই ব্যাখ্যা করে।

শেষ দৃশ্য

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হন সাদেক বাচ্চু। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঢাকার ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। তখন তাঁর বয়স ৬৫।

একজন অভিনেতার মৃত্যু হয়তো একটি নির্দিষ্ট দিনে ঘটে। কিন্তু চরিত্রের মৃত্যু হয় না এত সহজে। সাদেক বাচ্চুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আজও তাঁর কোনো পুরোনো চলচ্চিত্রে সেই পরিচিত চোখের দৃষ্টি দেখা গেলে দর্শক বুঝে যান- খারাপ লোকটি পর্দায় এসেছে। কোনো সংলাপের ভঙ্গি শুনলেই মনে পড়ে যায় সেই কণ্ঠ। কোনো পুরোনো নাটকের দৃশ্য সামনে এলে মনে পড়ে যায় সেই অভিনেতাকে, যাঁকে একদিন দর্শক এতটাই সত্যি ভেবেছিলেন যে পাথর পর্যন্ত ছুড়ে মেরেছিলেন। সেটিই হয়তো একজন অভিনয়শিল্পীর সবচেয়ে অদ্ভুত সাফল্য- মানুষ তাঁকে ভুলে যেতে পারে, চরিত্রকে নয়।

সাদেক বাচ্চু চলে গেছেন ছয় বছর হলো। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় তাঁর তৈরি করা অসংখ্য মানুষ এখনও বেঁচে আছে। কেউ খল, কেউ কঠোর, কেউ কৌতুকপ্রবণ, কেউ নির্মম। আর তাদের ভেতর দিয়েই বেঁচে আছেন মাহবুব আহমেদ সাদেক- দর্শকের কাছে চিরচেনা সাদেক বাচ্চু।