Advertisement

বাংলা সিনেমার ‘মুকুটহীন নবাব’ প্রবীর মিত্র

বাংলা সিনেমার ‘মুকুটহীন নবাব’ প্রবীর মিত্র
প্রবীর মিত্র

কেউ সিনেমায় রেখে যান কিছু স্মরণীয় চরিত্র, কেউ রেখে যান বিখ্যাত সংলাপ। আর প্রবীর মিত্র রেখে গেছেন এমন সব মানুষ, যাদের পর্দায় দেখে দর্শক মনে করেছেন, এ যেন তাদেরই খুব পরিচিত কেউ। কখনো জেলে, কখনও সাধারণ মানুষ, কখনও ইতিহাসের চরিত্র, আবার কখনও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া এক বাবা, বিভিন্ন বয়স, শ্রেণি ও পেশার মানুষের চরিত্রে নিজেকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করেছেন তিনি।

Advertisement

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে চার শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে প্রবীর মিত্র হয়ে উঠেছিলেন এক স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলীর অধিকারী। নায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে আটকে রাখেননি নায়ক পরিচয়ের মধ্যে। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তৈরি করেছেন নিজের আলাদা জায়গা।

আজ ১৮ আগস্ট। ১৯৪১ সালের এই দিনে চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন প্রবীর মিত্র। জন্ম চাঁদপুরে হলেও তার বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। সেন্ট গ্রেগরি স্কুল ও পোগজ স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে পড়াশোনা করেন জগন্নাথ কলেজে। শৈশব থেকেই সংস্কৃতিমনা ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে খেলাধুলাতেও ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা। ক্রিকেট খেলেছেন ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশনে, হকিতেও ছিলেন পারদর্শী।

অভিনয়ের সঙ্গে প্রবীর মিত্রের সম্পর্ক তৈরি হয় স্কুলজীবনেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে প্রহরীর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে হাতেখড়ি। পরে পুরান ঢাকার লালকুঠিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা করেন।

মঞ্চের সেই অভিজ্ঞতাই তাকে নিয়ে আসে চলচ্চিত্রে। পরিচালক এইচ আকবরের হাত ধরে ‘জলছবি’ সিনেমায় অভিষেক হয় তার। মজার বিষয়, একই সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা ফারুকেরও। ‘জলছবি’র গল্প ও সংলাপ লিখেছিলেন প্রবীর মিত্রের স্কুলজীবনের বন্ধু এবং পরবর্তী সময়ে কিংবদন্তি অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এ টি এম শামসুজ্জামান।

‘জলছবি’ নির্মিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালে এবং মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে। এরপর ১৯৬৮ সাল থেকে নিয়মিত চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন প্রবীর মিত্র, এমন তথ্যও তার জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রবীর মিত্রকে মূলত নায়ক চরিত্রেই দেখা গেছে। সুদর্শন চেহারা, সাবলীল অভিনয় ও ভরাট কণ্ঠ তাকে সে সময়ের দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।

‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘চাবুক’, ‘সীমার’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ’সহ বেশকিছু সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। তবে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আসে ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।

১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই কালজয়ী চলচ্চিত্রে ‘কিশোর’ চরিত্রে অভিনয় করেন প্রবীর মিত্র। সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙে পড়া এক জেলের অসহায়ত্ব, দারিদ্র্য ও অনিশ্চিত জীবনকে তিনি যে গভীরতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা তার অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে ১৯৬৭ সালে নির্মিত সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আনোয়ার হোসেন। সেই অভিনয়ের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ‘মুকুটহীন নবাব’ উপাধি।

এর ২২ বছর পর রঙিন ফরম্যাটে আবারও সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে সিনেমা নির্মিত হয়- ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রবীর মিত্র। ঐতিহাসিক এই চরিত্রে অভিনয় ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সিরাজউদ্দৌলার মতো একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের ভার তিনি নিজের অভিনয় দিয়ে ধারণ করেছিলেন। দর্শক-সমালোচকের প্রশংসাও পেয়েছিলেন। এটি তার উল্লেখযোগ্য নায়ক চরিত্রগুলোর একটি।

তবে ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র পর তার ক্যারিয়ারে একটি বড় পরিবর্তন আসে। প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ক্রমে হয়ে ওঠেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রাভিনেতা। প্রবীর মিত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই, তিনি কখনও নিজের অভিনয়কে নায়ক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

সময় যত গড়িয়েছে, ততই চরিত্রের বৈচিত্র্য ও অভিনয়ের গভীরতার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। বাবা, অভিভাবক, শিক্ষক, পুলিশ, জেলে কিংবা সমাজের সাধারণ মানুষের চরিত্র, যে ভূমিকাতেই হাজির হয়েছেন, নিজের অভিনয়শৈলীতে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। ‘নয়নের আলো’ সিনেমার মন্টু চরিত্রে তার অভিনয়ে ফুটে উঠেছিল বয়স ও অভিজ্ঞতার এক ভিন্ন মাত্রা। তরুণদের গল্পের ভেতরেও চরিত্রটি হয়ে উঠেছিল স্থিরতা ও আবেগের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

অন্যদিকে ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’ সিনেমায় রহমত আলী চরিত্রে তিনি ছিলেন শাকিব খানের চরিত্রের বাবা এবং একজন পুলিশ কনস্টেবল। জীবনের শেষ দিকের অভিনয়ে দায়িত্বশীল, কর্মজীবী বাবার চরিত্রে তাকে বারবার দেখা গেছে। প্রবীর মিত্রের অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘বড় ভালো লোক ছিল’। আবদুর রাজ্জাকের ইয়াসিনের বিপরীতে লোকমান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি।

প্রেম, প্রতিশোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধের টানাপোড়েনে থাকা এক সাধারণ মানুষের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের প্রশংসা কুড়ায়। এই সিনেমার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান।

তার পুরস্কারের তালিকায় আরও রয়েছে বাচসাসের সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার, এজেএফবি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন।

প্রবীর মিত্রের অভিনয়জীবন বিস্তৃত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়জুড়ে। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘জলছবি’, ‘চাবুক’, ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘অঙ্গার’, ‘পুত্রবধূ’, ‘নয়নের আলো’, ‘জয় পরাজয়’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চাষীর মেয়ে’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘আবদার’, ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’, ‘দেহরক্ষী’, ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘মাই নেম ইজ খান’, ‘মাই নেম ইজ সুলতান’, ‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’সহ অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।

তার অভিনীত সিনেমার সংখ্যা চার শতাধিক বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যার এই বিশালতা অবশ্য তার পরিচয়ের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বরং এত দীর্ঘ সময় ধরে এত বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করাই তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা করে রেখেছে।

পর্দার আড়ালে প্রবীর মিত্রের অভিনয়জীবনের আরেকটি গল্প ছিল ত্যাগের। একসময় চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের জন্য দেশের দুর্গম অঞ্চলে দিনের পর দিন থাকতে হতো। তখন ছিল না মোবাইল ফোন, ছিল না আজকের মতো সহজ যোগাযোগব্যবস্থা। ফলে অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাও সম্ভব হতো না। শুটিংয়ের কারণে দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাকে। সংসার ও সন্তানদের দায়িত্বের বড় অংশ সামলেছেন তার স্ত্রী। প্রবীর মিত্র নিজেও জীবদ্দশায় স্বীকার করেছিলেন, স্ত্রী সংসার আগলে রেখেছিলেন বলেই তিনি অভিনয়ে এতটা সময় দিতে পেরেছেন।

তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের কেউ অভিনয়ে আসেননি। এ বিষয়ে প্রবীর মিত্রের ধারণা ছিল, অভিনয় পেশার কঠিন বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার কারণেই হয়তো তাদের মা সন্তানদের এ পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন।

তবে অভিনয়কে তিনি কখনও কেবল পেশা হিসেবে দেখেননি। অর্থের হিসাবের চেয়ে মনের টানই ছিল তার কাছে বড়। অভিনয়কে তিনি প্রার্থনার মতো মনে করতেন। অন্য পেশায় নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছেন রঙ্গমঞ্চ ও চলচ্চিত্রের জগতেই।

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে গভীর বেদনাও বহন করেছেন প্রবীর মিত্র। তার স্ত্রী মারা যান ২০০০ সালে। ২০১২ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে ছোট ছেলে আকাশকেও হারান তিনি। সন্তান হারানোর সেই শোক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

জীবনের শেষদিকে শারীরিকভাবেও অসুস্থ ছিলেন এই অভিনেতা। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

প্রবীর মিত্রের মৃত্যুতে একটি দীর্ঘ অভিনয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তার অভিনয়জীবন কেবল পুরোনো সিনেমার তালিকায় আটকে নেই। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর কিশোর, ‘বড় ভালো লোক ছিল’-এর লোকমান, ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র সিরাজ, ‘নয়নের আলো’র মন্টু কিংবা ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’র রহমত আলী- প্রতিটি চরিত্রে তিনি রেখে গেছেন আলাদা এক প্রবীর মিত্রকে।

নায়ক হিসেবে যেমন দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও প্রমাণ করেছেন নিজের শক্তি। বয়স তাকে থামাতে পারেনি, চরিত্রের দৈর্ঘ্যও নয়। বরং পর্দায় কয়েক মিনিটের উপস্থিতিকেও তিনি এমনভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন, যা অনেক সময় পুরো সিনেমার স্মৃতির সঙ্গে থেকে গেছে। একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় যে তার বয়স, নায়ক হওয়ার মর্যাদা কিংবা চরিত্রের আকারে নয়-অভিনয়ের গভীরতায়, প্রবীর মিত্রের দীর্ঘ ক্যারিয়ার যেন তারই প্রমাণ।

অভিনয়শিল্পীর মৃত্যু হয়, কিন্তু তার সৃষ্টি ও চরিত্রের মৃত্যু হয় না। তাই প্রবীর মিত্রও ফিরে আসবেন বারবার- কিশোর, লোকমান, সিরাজউদ্দৌলা, মন্টু কিংবা রহমত আলী হয়ে। দর্শকের স্মৃতিতে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।

বাংলা সিনেমার ‘মুকুটহীন নবাব’ প্রবীর মিত্র