logo

বাবা থেকে শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলেন আমার নায়ক : ববিতা

বাবা থেকে শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলেন আমার নায়ক : ববিতা

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক রাজ রাজ্জাক। যে মানুষটি একাধারে একজন অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি আবেগের নাম, এক নির্ভরতার প্রতীক। অথচ তার শুরুটা ছিল নিতান্তই সাধারণ। 

‘রতন লাল বাঙালি’ সিনেমায় একজন পকেটমারের ছোট্ট চরিত্রে পর্দায় হাজির হয়েছিলেন তিনি। পরে ‘শিলালিপি’ ছবির একটি গানের দৃশ্যে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে পেয়েছিলেন মাত্র ২০ টাকা সম্মানী। সেই সামান্য অর্থই বাড়িয়ে দিয়েছিল আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন দেখার সাহস। তখন কেউ কল্পনাও করেননি, একদিন তিনিই হবেন বাংলা সিনেমার অবিসংবাদিত নায়ক।

সত্তরের দশকে জুটি হয়ে অগণিত দর্শকদের হৃদয় জয় করেছেন রাজ্জাক ও ববিতা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কালজয়ী এই জুটি কাজ করেছেন অসংখ্য সিনেমায়। তবে রাজ্জাকের সঙ্গে তার প্রথম ছবিতে মেয়ের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পান ববিতা। তবে শেষ পর্যন্ত তার নায়িকা হয়েই অভিনয় করেন ববিতা।

রাজ্জাকের সঙ্গে কাজ করার সেই স্মৃতিচারণ করলেন এ বর্ষীয়াণ অভিনেত্রী । গণমাধ্যমে প্রকাশিত রাজ্জাককে নিয়ে ববিতার একটি স্মৃতিচারণায় রাজ্জাকের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ সময়ের গল্প তুলে ধরেন ববিতা। 

তিনি লেখেন, নায়করাজ রাজ্জাক ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য নাম। আমার অভিনয় জীবনের শুরুতে তার হাত ধরেই সিনেমায় আসার সুযোগ হয়েছিল। রাজ্জাক ভাই ছিলেন আমার অভিভাবক, আমার শিক্ষক, আমার সহশিল্পী। আজ তার অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করতে গিয়ে হৃদয় ভরে যায় স্মৃতি আর শ্রদ্ধায়।

পর্দায় বাবার চরিত্র থেকে ববিতার নায়ক হয়ে যান রাজ্জাক। সেই ঘটনা প্রসঙ্গে ববিতা বলেন, তিনি যেমন এসেছিলেন কিংবদন্তি নির্মাতা জহির রায়হানের হাত ধরে, আমিও এসেছিলাম জহির ভাইয়ের সিনেমার মাধ্যমে। আমরা সতীর্থ। আমাদের প্রথম ছবি ‘সংসার’-এ তিনি ছিলেন আমার বাবার চরিত্রে, আর সুচন্দা আপু ছিলেন মা। এরপর শেষ পর্যন্ত সিনেমায় আমি হলাম তার নায়িকা। প্রথম ছিলেন পর্দার বাবা, আবার তার সঙ্গেই নায়িকা! এই ভেবে বেশ লজ্জাই পেয়েছিলাম। শুটিং শুরুর পর রাজ্জাক ভাই আমাকে সহজ করে নিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু আমাদের দীর্ঘ পথচলা।

অভিনয় জীবনে রাজ্জাকের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে ববিতার। স্মৃতিচারণা করে ববিতা বলেন, অনন্ত প্রেম সিনেমার শুটিংয়ের স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। ছবির গান ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি...’ গেয়েছিলেন খুরশীদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিন; কথা লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার; সুর করেছিলেন আজাদ রহমান। সেই গানটির শুটিং হয়েছিল কাপ্তাইয়ে; জঙ্গল ও পাহাড় পেরিয়ে তিন দিন ধরে। আশ্চর্যের বিষয়, গানের দৃশ্যের জন্য কোনো নৃত্য পরিচালক ছিলেন না। রাজ্জাক ভাই নিজেই আমাকে সাহস দিয়ে দৃশ্যটির পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি রসিকতার সুরে বলেছিলেন, নৃত্য পরিচালক হিসেবে কিন্তু আমার নাম যাবে পর্দায়।

ববিতার মতে, রাজ্জাক ভাই শুধু পর্দার নায়ক ছিলেন না; বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন সত্যিকারের নায়ক। পরিবারের সবার সঙ্গে আমার ছিল আপন সম্পর্ক। যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে তিনি আমাকে নিমন্ত্রণ করতেন। আড্ডা, হাসি-আনন্দে কাটত সেই সব মুহূর্ত। তিনি সবসময় শিল্পী আর চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবতেন। তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল ঢাকাই সিনেমা।

সত্তর ও আশির দশকে রাজ্জাক-ববিতা জুটি হয়ে ঝড় তুলেছিল পর্দায়। ‘আলোর মিছিল’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বিরহ ব্যথা’, ‘সোহাগ’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘মানুষের মন’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘আকাংখা’, ‘স্বরলিপি’, ‘আনারকলি’, ‘রাগী, ‘তওবা’, ‘নাতবৌ’, ‘আগমন’, ‘রাজবন্দী, ‘ভুল যখন ভাঙ্গলো’, ‘অসাধারণ, ‘প্রিয়তমা’, ‘ফুলশয্যা’, ‘প্রফেসর’– অর্ধশতাধিক চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অভিনয় করেছেন দুজন। তাদের জুটি বেঁধে অভিনয় করা অমর প্রেমের কাহিনি ‘লাইলী মজনু’ এখনও দর্শকদের হৃদয়ে অমলিন।