Advertisement

বাংলা নাটকের প্রাণপুরুষ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জন্মদিন আজ

বাংলা নাটকের প্রাণপুরুষ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জন্মদিন আজ

বাংলা নাটকের নিজস্ব ভাষা, লোকজ ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনসংগ্রামকে মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের অবদান অনন্য। আজ তার ৭৭তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে ঢাকায় শুরু হয়েছে বিশেষ নাট্য আয়োজন। ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের যৌথ উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী আয়োজনের পাশাপাশি পৃথক কর্মসূচি পালন করছে নাট্যসংগঠন স্বপ্নদল।

Advertisement

১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সেলিম আল দীন। তার বাবা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা ফিরোজা খাতুন। সেনেরখিলের মঙ্গলকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে এসএসসি এবং ১৯৬৬ সালে ফেনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলেও দ্বিতীয় বর্ষে রাজনৈতিক কারণে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন সেলিম আল দীন। পরে ১৯৮৬ সালে তার উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ। এই বিভাগকে তিনি নাট্যশিক্ষা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেন। ১৯৯৫ সালে ‘মধ্যযুগের বাংলা নাট্য’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

নাট্যকারের পাশাপাশি সেলিম আল দীন ছিলেন নাট্যতাত্ত্বিক, গবেষক, শিক্ষক, নির্দেশক ও সংগঠক। বাংলা নাটকের শিকড় ও নিজস্ব ঐতিহ্যের সন্ধানে তিনি আজীবন কাজ করেছেন। লোকজ জীবন, ইতিহাস, পুরাণ, লোকবিশ্বাস এবং মানুষের অস্তিত্বের নানা সংকট তার নাটকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রচলিত নাট্যরীতির বাইরে গিয়ে বাঙালির নিজস্ব আখ্যান, ভাষা ও পরিবেশনরীতিকে আধুনিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ঐতিহ্যকে অতীতের বিষয় হিসেবে না দেখে সমকালীন জীবনের সঙ্গে তার যোগসূত্র তৈরি করা। তার নাটকের চরিত্রগুলোর বড় অংশই প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষ। তাদের জীবন, ভাষা, স্বপ্ন, বেদনা, ক্ষুধা, বিশ্বাস, প্রতিরোধ ও অস্তিত্বের সংকটকে তিনি শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন। ফলে তার নাট্যভুবনে একই সঙ্গে লোকজ ঐতিহ্য, সমকালীন জীবনবোধ ও দার্শনিক অনুসন্ধানের উপস্থিতি দেখা যায়।

তার উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘প্রাচ্য’, ‘বনপাংশুল’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’, ‘স্বর্ণবোয়াল’সহ আরও অনেক নাটক। ‘চাকা’য় মৃত্যুযাত্রার মধ্য দিয়ে মানবজীবনের নির্মম বাস্তবতা, ‘যৈবতী কন্যার মন’-এ নারীজীবনের জটিলতা এবং ‘হরগজ’-এ দুর্যোগ, মৃত্যু ও মানুষের অসহায়তার চিত্র উঠে এসেছে।

পাশ্চাত্য শিল্পের প্রচলিত বিভাজনকে প্রশ্ন করে তিনি বাঙালির দীর্ঘ নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের আলোকে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’-এর কথা বলেন। তার শিল্পভাবনায় নাটকের সঙ্গে কবিতা, উপন্যাস, সংগীত, চিত্রকলা, লোককাহিনি ও আখ্যানের বিভিন্ন উপাদানের মেলবন্ধন ঘটেছে। এ কারণে তার নাটক প্রচলিত নাট্যরীতির সীমা অতিক্রম করে স্বতন্ত্র একটি আখ্যানভাষা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের নাট্যচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে তিনি ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠায় যুক্ত ছিলেন। পরে ১৯৮১-৮২ সালে দেশব্যাপী গড়ে ওঠে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। শহরের মঞ্চের বাইরে গ্রামবাংলার মানুষের কাছে নাটক পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যও ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তার সৃষ্টির প্রভাব মঞ্চের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। ‘চাকা’ চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করে। ‘হরগজ’ সুইডিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল হিন্দি ভাষায় এটি মঞ্চস্থ করেছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও তার নাটক পাঠ্য হয়েছে।

সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে একুশে পদক পান সেলিম আল দীন। ২০২৩ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়।

২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন সেলিম আল দীন। তার মৃত্যুর পরও থেমে নেই তাঁর নাট্যভাবনার চর্চা। দেশের বিভিন্ন মঞ্চে তাঁর নাটক নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীরা তার সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা ও নিরীক্ষা করছেন।

সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার যৌথভাবে তিন দিনব্যাপী নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছে। ১৮ আগস্ট সেলিম আল দীনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয় তার রচিত ‘নিমজ্জন’; নির্দেশনায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ।

১৯ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হবে ‘জহরনামা’। কাজী নজরুল ইসলামের গল্প অবলম্বনে নাটকটির পাণ্ডুলিপি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন আনন জামান। পরিবেশনায় থাকবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ।

২০ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চস্থ হবে ‘একসাথে চলি একসাথে বাঁচি’। এ এইচ রাজন ও রফিকুল ইসলামের রচনায় নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। পরিবেশনায় থাকবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নাট্য সংগঠন সুন্দরম।

অন্যদিকে, সেলিম আল দীনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনের আয়োজন করেছে স্বপ্নদল। ১৮ আগস্ট সকালে নাট্যাচার্যের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের কর্মসূচি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলাভবন থেকে সমাধি অভিমুখে স্মরণ-শোভাযাত্রা, পুষ্পাঞ্জলি এবং তার জীবন, কর্ম ও নাট্যদর্শন নিয়ে আলোচনা রয়েছে এ আয়োজনের অংশ হিসেবে।

স্বপ্নদলের আয়োজনে ২০ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে বিকেল সাড়ে ৫টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মঞ্চস্থ হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’। এটি স্বপ্নদলের ১২৪ ও ১২৫তম প্রদর্শনী। ২১ আগস্ট একই সময়ে একই মঞ্চে সেলিম আল দীনের ‘হরগজ’-এর ৫২ ও ৫৩তম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। দুই প্রযোজনারই নির্দেশনা দিয়েছেন সেলিম আল দীনের ছাত্র জাহিদ রিপন।

‘চিত্রাঙ্গদা’য় প্রেম, আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। আর ‘হরগজ’-এ ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জের হরগজে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ টর্নেডোর পটভূমিতে মানুষের বিপর্যয়, অসহায়ত্ব ও সহমর্মিতার গল্প তুলে ধরেছেন সেলিম আল দীন।

জন্মবার্ষিকীর এসব আয়োজন তাই শুধু একজন নাট্যকারকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়। তার নাটক, নাট্যভাবনা ও সাংস্কৃতিক দর্শনের মধ্য দিয়ে বাংলা নাটকের নিজস্ব শিকড় ও ঐতিহ্যকে নতুন করে দেখারও সুযোগ তৈরি করছে। সেলিম আল দীনের শিল্পভাবনার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত এখানেই- নিজের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির গভীরে গিয়ে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।

বাংলা নাটকের প্রাণপুরুষ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জন্মদিন আজ