শিল্পকলার মঞ্চে আসছে ‘পিয়ারু গাজির গল্পের দেশ’

ঢাকার মঞ্চে আসছে নতুন নাটক ‘পিয়ারু গাজির গল্পের দেশ’। নরওয়ের নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের কালজয়ী নাটক ‘পিয়ের গিন্ট’ অবলম্বনে এটি নির্মাণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ। আগামী ২৫ থেকে ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় নাটকটির মঞ্চায়ন হবে।
মানুষ নিজের সম্পর্কে যে গল্প তৈরি করে, একসময় সেই গল্পের আড়ালেই কি হারিয়ে যায় তার প্রকৃত পরিচয়? সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার মোহ, কল্পনা আর আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া একজন মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে নাটকটি। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে অতীতের মুখোমুখি হওয়া এবং নিজের কাছে ফিরে আসার আকুতিই এর অন্যতম প্রধান অনুসন্ধান।
নাটকটির রচনা করেছেন ড. শাহমান মৈশান। পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবির। ইবসেনের ‘পিয়ের গিন্ট’ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও এটি সরাসরি ভাষান্তর নয়। বরং নরওয়ের নাট্যজগৎকে বাংলার মানুষের ভাষা, স্মৃতি, কথকতা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশক আহমেদুল কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, নাটকটির প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম সেমিস্টারে 'তাবুলা রাসা' প্রযোজনার মধ্য দিয়ে। ইবসেনের ‘অ্যা ডলস হাউস’, ‘ওয়াইল্ড ডাক’ ও ‘পিয়ের গিন্ট’ নাটকের পাঠ ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নাট্যচরিত্র, শরীরী অভিব্যক্তি এবং অভিনয়ের ভাষা নিয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সেই পাঠ ও গবেষণা ধীরে ধীরে নাট্যরূপান্তর, পুনর্নির্মাণ এবং নতুন করে রচনা করার প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়।
নাটকটির নির্মাণপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন স্নাতকোত্তর ২০২৩-২০২৪ ও ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। নির্দেশকের পরিকল্পনায়, প্রথম পর্যায়ে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে শরীর, চলন ও চিন্তার মাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা করা হয়। পরে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং অভিনয়নির্ভর পরিবেশনার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইম্প্রোভাইজেশন, চরিত্র বিশ্লেষণ, অভিনয়পদ্ধতি ও সম্মিলিত সংগীতচর্চার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রযোজনাটির নিজস্ব নাট্যভাষা।
নাটকটিতে স্বপ্ন ও স্মৃতি, বাস্তব ও কল্পনা, বিস্ময় ও দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা পাশাপাশি উঠে আসবে। ব্যক্তিমানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটের পাশাপাশি সমকালীন বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতাকাঠামো ও ক্ষমতার বৈধতা তৈরির প্রবণতাকেও নাট্যভাষায় অনুসন্ধানের চেষ্টা রয়েছে।
নির্দেশকের ভাবনায়, মানুষ জীবনের নানা পর্যায়ে নিজের ব্যর্থতা ও অপূর্ণতাকে আড়াল করতে কখনো কখনো নিজের জন্যই একটি কল্পিত পরিচয় তৈরি করে। কিন্তু সব ছলনা ও আত্মপ্রবঞ্চনার পর একসময় তাকে নিজের মুখোমুখি হতে হয়। তখন সামনে আসে একটি মৌলিক প্রশ্ন- ‘আমি কে?’ নাটকটির মধ্য দিয়ে সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই প্রযোজনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ব্যক্তিগত শোকের স্মৃতিও। নির্দেশক জানিয়েছেন, নাটকটির স্বপ্ন ও নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমো। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল তাকে হারান তারা। তার স্মৃতি ও সৃজনশীল উপস্থিতি নাটকটির পুরো নির্মাণযাত্রায় অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন নির্দেশক।
গত বছর একই বিভাগের ড. শাহমান মৈশানের রচনা এবং ড. আহমেদুল কবিরের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘পাখিদের বিধানসভা’। নতুন প্রযোজনা ‘পিয়ারু গাজির গল্পের দেশ’ নির্মাণে রয়্যাল নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে।
আগামী ২৫ থেকে ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় নাটকটির মঞ্চায়ন হবে। প্রদর্শনীর সময়সূচি ও টিকিটসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।