logo
Advertisement

শতবর্ষে ভূপেন হাজারিকা

শতবর্ষে ভূপেন হাজারিকা
ভূপেন হাজারিকা। ছবি: ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে

পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশ ঘেঁষে আসামের শদিয়া। প্রকৃতি, নদী আর লোকজ সংস্কৃতির নিবিড় সংস্পর্শে বেড়ে ওঠা সেই জনপদেই ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম নিয়েছিলেন এমন একজন মানুষ, যার কণ্ঠ পরে ছড়িয়ে পড়েছিল সীমানার বহু দূর পর্যন্ত। তিনি ভূপেন হাজারিকা- শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক এবং মানুষের কথা বলা এক অনন্য কণ্ঠ।

আজ তার জন্মশতবর্ষ। একশ বছর আগে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটি নেই ১৫ বছর ধরে। ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর ৮৫ বছর বয়সে চলে গেছেন ভূপেন হাজারিকা। কিন্তু তার চলে যাওয়া তার গানকে থামাতে পারেনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, তার গানের কথাগুলো ততই নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়েছে।

যে নদীর স্রোতে জন্ম নিয়েছিল মানুষের গান

শদিয়ার সঙ্গে ভূপেন হাজারিকার সম্পর্ক কেবল জন্মভূমির নয়; তার শিল্পীসত্তার সঙ্গেও যেন এই ভূপ্রকৃতির গভীর যোগ ছিল। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদী, পাহাড়, লোকজ জীবন আর সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ তার শিল্পচিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে তার গানের বড় একটি অংশজুড়ে জায়গা করে নেয় মানুষ, সমাজ, শোষণ, বৈষম্য, ভালোবাসা ও মানবিকতার প্রশ্ন।

তার গান তাই নিছক বিনোদনের জন্য ছিল না। কখনো তা হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, কখনো বিবেক জাগানোর আহ্বান, আবার কখনো মানুষের প্রতি মানুষের দায় মনে করিয়ে দেওয়ার এক সরল উচ্চারণ।

এই কারণেই ভূপেন হাজারিকার গান ভাষার সীমা অতিক্রম করেছে। অসমিয়া ভাষায় লেখা গান যেমন অসমের মানুষের প্রাণের অংশ হয়ে উঠেছে, তেমনি বাংলায় তার কণ্ঠ পেয়েছে আলাদা জনপ্রিয়তা। হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের সংগীতভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছেন। তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রে ছিল মানুষের সার্বজনীন অভিজ্ঞতা- যে অভিজ্ঞতার কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা ভূগোল নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও তাঁর সংগীতকে ন্যায়, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা বহনকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

শৈশবেই শুরু, কৈশোরেই চলচ্চিত্র

ভূপেন হাজারিকার প্রতিভার প্রকাশ ঘটে খুব অল্প বয়সে। মাত্র ১০ বছর বয়সে গান লেখা ও সুর করার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ১৯৩৬ সালে কলকাতার অরোরা স্টুডিওতে তার প্রথম গান রেকর্ড হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর মাত্র কয়েক বছর পর, ১২ বছর বয়সে জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার ‘ইন্দ্রমালতী’ চলচ্চিত্রে গান করেন তিনি।

চলচ্চিত্রটি ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় এবং এটি ছিল দ্বিতীয় অসমিয়া পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

শৈশবের এই অভিজ্ঞতাই পরে তাকে শুধু গায়ক নয়, বহুমাত্রিক চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। সংগীত পরিচালনা, গান লেখা, অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণ- বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করেছেন তিনি। ‘এরা বাটর সুর’, ‘শকুন্তলা’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘লতিঘটি’, ‘চিকমিক বিজুলি’সহ একাধিক অসমিয়া চলচ্চিত্রে তাঁর সৃজনশীল উপস্থিতি ছিল। পরবর্তী সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রেও তার সংগীত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শিক্ষার জগতেও ছিলেন ব্যতিক্রমী

ভূপেন হাজারিকার জীবনকে শুধু সংগীত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার শিক্ষাজীবনও ছিল অসাধারণ। কটন কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে স্নাতক এবং ১৯৪৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ১৯৫২ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষায় অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির ব্যবহার।

অর্থাৎ তার জগৎ ছিল একই সঙ্গে শিল্প, শিক্ষা, সমাজ ও মানুষের জীবনকে ঘিরে। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাই হয়তো তার গানকে অন্য অনেক শিল্পীর গান থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।

‘মানুষ মানুষের জন্য’- একটি গানের চেয়েও বেশি

বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে ভূপেন হাজারিকার পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাগুলোর একটি তার বাংলা গান। ‘মানুষ মানুষের জন্যে’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘গঙ্গা তুমি বইছো কেন’, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’—এসব গান কেবল জনপ্রিয় হয়নি, মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেছে।

বিশেষ করে মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতার যে আহ্বান তিনি তাঁর গানে রেখেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের স্পর্শ করেছে। তার গান মনে করিয়ে দিয়েছে- মানুষের পরিচয় শেষ পর্যন্ত মানুষ হওয়াতেই।

ভূপেনের সংগীতে নদীও বারবার ফিরে এসেছে। নদী কখনো তার কাছে প্রকৃতির সৌন্দর্য, কখনো মানুষের জীবনের প্রতীক, আবার কখনো সমাজের নীরব সাক্ষী। নদীর উদ্দেশে করা তার প্রশ্ন আসলে মানুষের কাছেই প্রশ্ন- মানুষের কষ্ট দেখে আমরা কতটা নির্বিকার থাকতে পারি? এই জায়গাতেই ভূপেন হাজারিকার গান কেবল গান থাকে না; তা হয়ে ওঠে সামাজিক বক্তব্য।

অসম থেকে বাংলা, বাংলা থেকে উপমহাদেশ

ভূপেন হাজারিকার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সাংস্কৃতিক সীমানা অতিক্রম করার ক্ষমতা। তিনি অসমিয়া লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে আধুনিক সংগীতের সঙ্গে মিলিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় গান করেছেন এবং চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। বিশেষ করে হিন্দি সিনেমায় অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক আবহকে বৃহত্তর ভারতীয় দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

‘রুদালি’ চলচ্চিত্রের ‘দিল হুম হুম করে’ তার সংগীতসৃষ্টির আরেকটি স্মরণীয় উদাহরণ। এই গান তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও পরিচিত করে তোলে। ফলে ভূপেন হাজারিকা একই সঙ্গে ছিলেন আঞ্চলিক শিকড়ে দৃঢ় এবং সর্বভারতীয় পরিসরে গ্রহণযোগ্য একজন শিল্পী।

রাজনীতিতেও মানুষের পাশে

মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তার শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৬৭ সালে তিনি আসামের নওবইচা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বিধায়কও হয়েছিলেন। যদিও রাজনীতি তার মূল পরিচয় হয়ে ওঠেনি, জনজীবনের নানা প্রশ্নে তার সম্পৃক্ততা ছিল স্পষ্ট।

তার শিল্পীসত্তার মূল জায়গাটি ছিল মানুষের পাশে থাকা। তাই তার গানে যেমন নিপীড়িত মানুষের কথা এসেছে, তেমনি এসেছে সামাজিক সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার আকাঙ্ক্ষা।

সম্মান এসেছে একের পর এক

দীর্ঘ কর্মজীবনে ভূপেন হাজারিকা পেয়েছেন ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বহু সম্মাননা। ১৯৭৫ সালে ‘চামেলি মেমসাহেব’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ১৯৭৭ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৯২ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০১ সালে পদ্মভূষণে ভূষিত হন। ২০০৮ সালে পান সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ এবং ২০০৯ সালে আসাম রত্ন। মৃত্যুর পর ২০১২ সালে তাকে পদ্মবিভূষণ দেওয়া হয়।

তবে সব সম্মাননার ওপরে জায়গা করে নেয় ২০১৯ সালের ভারতরত্ন। ওই বছর ভারত সরকার মরণোত্তরভাবে তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায় ভূষিত করে। ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ভবনে তার হয়ে এই সম্মান গ্রহণ করা হয়।

তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ভূপেন হাজারিকার গান ও সংগীত প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের কাছে সমাদৃত এবং তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ন্যায়, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।

মানুষ চলে যায়, গান থেকে যায়

ভূপেন হাজারিকা নিজেকে ‘যাযাবর’ ভাবতেন। তার শিল্পজীবনও ছিল তেমন- এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়, এক ভূগোল থেকে অন্য ভূগোলে, এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে তার সৃষ্টির যাত্রা।

কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার কেন্দ্রে ছিল একটি বিষয়- মানুষ। তাই তার গান আজও পুরোনো মনে হয় না। পৃথিবী বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, শ্রোতার রুচি বদলেছে; কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের দায়, সহমর্মিতা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন কিংবা ভালোবাসার প্রয়োজন- এসব বদলায়নি। সেখানেই ভূপেন হাজারিকার প্রাসঙ্গিকতা।

১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শদিয়ায় যে কণ্ঠের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০১১ সালের নভেম্বরে তার শারীরিক অবসান ঘটেছে। কিন্তু তার গান থামেনি। জন্মের একশ বছর পরও সেই কণ্ঠ যেন একই প্রশ্ন করে যায়- মানুষ কি মানুষের পাশে দাঁড়াবে?

সম্ভবত এ কারণেই ভূপেন হাজারিকা শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়। তিনি হয়ে আছেন মানুষের গান, মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।