logo
Advertisement

মিলাদুন্নবী ও বাংলা গানে নবীপ্রেমের ঐতিহ্য

মিলাদুন্নবী ও বাংলা গানে নবীপ্রেমের ঐতিহ্য
ছবি: এআই

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনকে ঘিরে যুগে যুগে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গান ও নাত। বাংলা ভাষাতেও নবীপ্রেমের সেই প্রকাশ পেয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী সংগীত থেকে শুরু করে লোকগান, নাশিদ ও আধুনিক ইসলামী সংগীতে। এসব গানে কখনো উঠে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও আগমনের কথা, কখনো মদিনার প্রতি আকুলতা, আবার কখনো প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। বাংলা গানের ভাণ্ডারে নবীপ্রেমের এমনই উল্লেখযোগ্য কিছু গান:

Advertisement

‘হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু’

‘হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু’- কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ও সুরের এই নাতে রাসুলে ফুটে ওঠে নবী (সা.)-এর আগমনের নূরানী আবহ। নজরুলের ইসলামী সংগীতের অন্যতম পরিচিত এই গানটি ১৯৪২ সালে আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে রেকর্ড হয়। পরবর্তীতে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠেও গানটি পরিবেশিত হয়েছে।

‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’

‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ, এলো রে দুনিয়ায়’- শিরোনামেই যার বিষয় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমন। কাজী নজরুল ইসলামের এই গানটি ১৯৩৫ সালে আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে রেকর্ড হয়। গানটির সুরে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ‘কাটিবিম’ সুরের প্রভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সময়ের সঙ্গে গানটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে নবীপ্রেমের অন্যতম পরিচিত সংগীতে পরিণত হয়েছে।

‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মমুহূর্তকে কেন্দ্র করে নজরুলের আরেক কালজয়ী সৃষ্টি- ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’। আমিনা (রা.)-এর কোলে নবজাতক মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনকে কবি এখানে আনন্দ ও বিস্ময়ের আবহে তুলে ধরেছেন। আব্বাসউদ্দীন আহমদের সময় থেকেই গানটি জনপ্রিয়তা পায়; পরবর্তীতে বহু শিল্পী গানটি পরিবেশন করেছেন।

‘এলো কে কাবার ধারে আধার চিরে’

কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলা ইসলামী সংগীতে নবীপ্রেমকে নতুন ভাষা দিয়েছেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। ‘এলো কে কাবার ধারে আধার চিরে’ গানটিতে আমিনা (রা.)-এর কোলে চাঁদের মতো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গানটি মল্লিকের বহুল পরিচিত ইসলামী সংগীতগুলোর একটি।

‘ছেড়ে দে নৌকা, আমি যাবো মদিনা’

নবীপ্রেম শুধু নাত বা গজলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রবেশ করেছে বাংলার লোকসংগীতের শরীরেও। আবদুর রহমান বয়াতীর ‘ছেড়ে দে নৌকা, আমি যাবো মদিনা’ তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। গানটির কথায় মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও রওজা জিয়ারতের আবেগ ফুটে উঠেছে। আবদুর রহমান বয়াতীর পরিবেশনার পাশাপাশি পরবর্তীতে শফি মণ্ডলসহ অন্য শিল্পীরাও গানটি গেয়েছেন।

‘রাসুল নামে কে এলো মদিনায়’

বাংলার লোকজ ভাষায় নবীপ্রেমের আরেক অনন্য প্রকাশ পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘রাসুল নামে কে এলো মদিনায়’। গানটির কথা ও সুর দুটিই জসীমউদ্দীনের। লালনসংগীতের শিল্পী ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে গানটি বিশেষভাবে পরিচিতি পেয়েছে। লোকজ সুর ও ভাষার মধ্য দিয়ে রাসূল (সা.)-এর আগমনকে দেখার ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায় এই গানে।

‘আকাশ হতে চাঁদ নেমেছে’

‘আকাশ হতে চাঁদ নেমেছে, মা আমিনার কোলে’—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মকে চাঁদের আগমনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এই জনপ্রিয় নাতে। গানটির কথা আজিজুর রহমানের এবং সুর করেছেন হাসনাত আবদুল কাদের। পরবর্তীতে জায়মা নূর, শাহবুদ্দীন শিহাবসহ অনেক শিল্পী গানটি পরিবেশন করেছেন।

‘সাহারাতে ফুটল রে রঙিন গুলে লালা’

মরুভূমির সাহারায় ফুল ফোটার রূপকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনকে কল্পনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। ‘সাহারাতে ফুটল রে রঙিন গুলে লালা’ তার অন্যতম পরিচিত নাতে রাসুল। গানটির পুরোনো রেকর্ডে আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মরুর বুকে ফুল ফোটার উপমায় নবী (সা.)-এর আগমনে পৃথিবীর আলোকিত হয়ে ওঠার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে এতে।

‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’

বাংলা মিলাদ ও নাতের আসরে বহুল উচ্চারিত ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ মূলত আরবি সালাম ও নাতের ঐতিহ্যের অংশ। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মিলাদ মাহফিল ও নাতের আসরেও দীর্ঘদিন ধরে এটি পরিবেশিত হয়ে আসছে। সম্প্রতি রূপক আনন্দের কণ্ঠে গানটির পরিবেশনাও শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের নবীপ্রেমের সাংস্কৃতিক চর্চায় গানটি আলাদা স্থান করে নিয়েছে।

‘বাংলাদেশের প্রান্ত হতে’

‘বাংলাদেশের প্রান্ত হতে, সালাম জানাই হে রাসুল’—দেশের মাটি থেকে মদিনার নবীর প্রতি ভালোবাসা ও সালাম জানানোর আবেগ ফুটে উঠেছে এই গানে। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের জনপ্রিয় নাত ও ইসলামী সংগীতের মধ্যে গানটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তার অনেক গানই সাইমুমসহ বিভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

‘তলায়াল বাদরু আলাইনা’

‘তলায়াল বাদরু আলাইনা’ মদিনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনকে স্মরণ করা ঐতিহ্যবাহী আরবি নাতের পংক্তি। বাংলা ভাষায় মতিউর রহমান মল্লিকের রচনায় এটি পেয়েছে নতুন রূপ। তাফাজ্জল হোসাইন খানের সুরে গানটি বাংলাদেশে বহু শিল্পীর কণ্ঠে পরিবেশিত হয়েছে। আব্দুল্লাহ আল নোমান, মাহফুজ মামুন, আব্দুল্লাহ বিন ফয়েজ, এ কে জিলানী ও পি এম মিজানের সম্মিলিত পরিবেশনাও রয়েছে।

‘আমিনা-দুলাল নাচে হালিমার কোলে’

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শৈশবকে কেন্দ্র করে নজরুলের আরেক মায়াময় সৃষ্টি—‘আমিনা-দুলাল নাচে হালিমার কোলে’। আমিনা (রা.), হালিমা (রা.) এবং নবী (সা.)-এর শৈশবের স্মৃতিকে কবি এখানে উৎসবের আবহে এঁকেছেন। গানটি নজরুলসংগীতের ইসলামী গানের repertoire-এর অংশ। এর পুরোনো পরিবেশনার সঙ্গে মনু মিয়া নামে পরিচিত মোহাম্মদ কাশেমের নামও উল্লেখ করা হয়।

নজরুলের কলমে, জসীমউদ্দীনের লোকজ ভাষায়, আবদুর রহমান বয়াতীর কণ্ঠে কিংবা মতিউর রহমান মল্লিকের ইসলামী সংগীতে- রূপ বদলেছে, বদলায়নি ভালোবাসা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে গানের ভাষা, সুর ও পরিবেশনা; কিন্তু বাংলা গানে রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সালামের সেই আবেগ রয়ে গেছে একই।

ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনে তাই বাংলা গানের সুরেও উচ্চারিত হয় সেই চিরন্তন প্রেমের ভাষা - নবীপ্রেম।

মিলাদুন্নবী ও বাংলা গানে নবীপ্রেমের ঐতিহ্য