logo

বাংলা নববর্ষে শিরোনামহীনের অস্ট্রেলিয়া ট্যুর

বাংলা নববর্ষে শিরোনামহীনের অস্ট্রেলিয়া ট্যুর

বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীন আগামী এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়া সফরে যাচ্ছে। সফরের সূচনা হবে সিডনিতে বাংলা নববর্ষ সাংস্কৃতিক উৎসব ও মেলাতে একটি ওপেন এয়ার কনসার্ট পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। সম্প্রতি শিরোনামহীনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় সিডনি সম্প্রদায়ের কাছে সংগীতের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শিকড়কে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে নিয়মিত এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। যদিও বিগত বছরে এই আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব না হলেও এ বছর শিরোনামহীনের পরিবেশনার মাধ্যমে আবার এই আয়োজন প্রাণ ফিরে পাবে বলে জানা গেছে। সিডনির অনুষ্ঠান শেষে ব্যান্ডটি অস্ট্রেলিয়ার একাধিক অঙ্গরাজ্যে পরিবেশনা করবে। এই সফর আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা সংগীত ঐতিহ্যের পতাকাবাহী হিসেবে শিরোনামহীনের দীর্ঘদিনের ভূমিকার ধারাবাহিকতা বহন করছে। 

শিরোনামহীন দেশ-বিদেশে আড়াই হাজারের বেশি কনসার্টে অংশ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশনার মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব মালায়া (মালয়েশিয়া, ২০১৬), গল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল (শ্রীলঙ্কা, ২০১৪), বাংলাদেশ দূতাবাসের আমন্ত্রণে প্যারিসের স্ট্যাড দ্য স্টেইন স্টেডিয়ামে কনসার্ট (২০২২), অস্ট্রেলিয়া ট্যুর (২০২৩), পশ্চিমবঙ্গে নিয়মিত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং নভেম্বর ২০২৫-এ প্রথম কানাডা সফর। এসব পরিবেশনা তাদেরকে সমকালীন বাংলা সংগীত ঐতিহ্যের প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে সমৃদ্ধ করেছে।

২০০৪ সালে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম জাহাজীর মাধ্যমে শিরোনামহীন সর্বশ্রেণির শ্রোতাদের কাছে স্বীকৃতি পায়। ‘হাসিমুখ’ ও ‘জাহাজী’ গান দুটি আধুনিক বাংলা সংগীতের ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত। পরবর্তীতে ‘হাসিমুখ’ কোক স্টুডিও বাংলায় থিম সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হলে নতুন প্রজন্মের কাছেও তা পুনরায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ পর্যন্ত ব্যান্ডটি আটটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম, একাধিক সিঙ্গেল ও মৌলিক সাউন্ডট্র্যাক প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ অ্যালবাম বাতিঘর একটি আনপ্লাগড প্রযোজনা, যেখানে অর্গানিক ও অ্যাকুস্টিক যন্ত্রের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ও ডিজিটাল সংগীতের ক্রমবর্ধমান চর্চার সময়ে এই অ্যালবামটি শাস্ত্রীয় ধ্বনি ও প্রাকৃতিক সুরের প্রতি প্রত্যাবর্তনের একটি সচেতন প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় তিন দশক ধরে শিরোনামহীন বাংলা শাস্ত্রীয় ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে একটি স্বতন্ত্র সংগীতভাষা গড়ে তুলেছে। ব্যান্ডের সুর ও সংগীতায়োজনে রাগভিত্তিক মেলোডিক ধারা ও দেশীয় তালচক্রের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। তাদের সংগীতে সরোদ, বাঁশি, চেলো, ব্যাঞ্জো, বোধরানসহ দেশীয় পারকাশন যন্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি ইলেকট্রিক গিটার ও আধুনিক ব্যান্ড অ্যারেঞ্জমেন্টের সমন্বয় রয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও বাউল দর্শনের প্রভাব তাদের গানে সুস্পষ্ট। ২০১০ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামটি আধুনিক ব্যান্ড কাঠামোয় ক্লাসিক বাংলা গানের পুনর্বিন্যাস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শিরোনামহীনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বহুযন্ত্রী পরিবেশনার ঐতিহ্য। ব্যান্ড লিডার জিয়াউর রহমান গীতিকার, বেজবাদক ও চেলোবাদক হিসেবে সংগীতপ্রেমী শ্রোতাদের কাছে প্রিয়মুখ। তার লেখায় অভিবাসন, নগর বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক রূপান্তরের বিষয় উঠে আসে। জিয়াউর রহমান ছাড়াও অন্যতম সুরকার কাজি আহমেদ শাফিন ড্রামস, বাঁশি, সরোদ ও পরীক্ষামূলক সাউন্ড ডিজাইনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহারকে প্রজন্মের তরুণ মিউজিসিয়ানদের কাছে জনপ্রিয় করেছেন। এ রকম অনন্য সৃষ্টিশীল ও পরীক্ষামূলক সঙ্গীত আয়োজন দক্ষিণ এশীয় সমকালীন সংগীতে শিরোনামহীনকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিরোনামহীনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। তাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এক মিলিয়নের বেশি সাবস্ক্রাইবার এবং ফেসবুকে দেড় মিলিয়নের অধিক অনুসারী রয়েছে।

ব্যান্ডটি তাদের নবম স্টুডিও অ্যালবামের কাজ শুরু করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আসন্ন সফরের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। বিশ্ব সংগীত যখন ক্রমশ একরৈখিক হয়ে উঠছে, তখন শিরোনামহীনের সংগীত প্রবাসী ও দেশীয় শ্রোতাদের কাছে বাংলাদেশের সুরভিত উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলা শাস্ত্রীয় ধারা, সাহিত্যিক গীতিকবিতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে বহন করে চলেছে।