নুসরাত ফাতেহ আলি খান: যে কণ্ঠে সীমানা পেরিয়েছিল সুফি সংগীত

কিছু কণ্ঠ বুঝতে ভাষা জানা জরুরি নয়। গানের কথা বুঝতে না পারলেও সেই কণ্ঠের আবেগ ছুঁয়ে যায় শ্রোতাকে। সুরের ওঠানামা, গায়কির গভীরতা আর পরিবেশনায় তৈরি হয় এক অন্য রকম অনুভূতি। পাকিস্তানের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী নুসরাত ফাতেহ আলি খানের কণ্ঠ ছিল তেমনই এক বিস্ময়। কাওয়ালির ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন বিশ্বের নানা প্রান্তে। তার গানে যেমন ছিল আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া, তেমনি ছিল সংগীতের প্রচলিত গণ্ডি ভেঙে নতুন কিছু করার সাহস।
১৯৯৭ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার গাওয়া গান এখনও নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছাচ্ছে, পুরোনো শ্রোতাকে ফিরিয়ে নিচ্ছে স্মৃতির কাছে। আজ ১৩ অক্টোবর এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের লায়ালপুরে, বর্তমান পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সংগীতের ইতিহাসে তার অবদান স্মরণ করার জন্য জন্মদিনটি তাই বিশেষ উপলক্ষ।
পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে সংগীতের পথে
নুসরাত ফাতেহ আলি খানের সংগীতযাত্রার পেছনে ছিল দীর্ঘ পারিবারিক ঐতিহ্য। তার পরিবার কয়েক শতাব্দী ধরে কাওয়ালি পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাবা ফাতেহ আলি খান ছিলেন একজন প্রখ্যাত কাওয়াল ও সংগীতজ্ঞ। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের আবহে বেড়ে উঠলেও নুসরাতের শিল্পীজীবনের শুরুটা ছিল একেবারে নিজস্ব পথ তৈরি করার গল্প।
১৯৬৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের কাওয়ালি ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তার ওপর এসে পড়ে। এর আগে অবশ্য তিনি সংগীতের নানা দিক সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন। কাওয়ালির পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কিছু ধারাও তার গায়কিকে সমৃদ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে এই প্রশিক্ষণ তাকে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার সুর, দ্রুত স্বর পরিবর্তন এবং তাৎক্ষণিক সংগীত পরিবেশনায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশ্যে কাওয়ালি পরিবেশন শুরু করেন নুসরাত। প্রথম দিকে পরিবারের অন্য শিল্পীদের সঙ্গে গান করতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র গায়কির মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালির কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকলেও কণ্ঠের বিস্তার, আবেগের প্রকাশ এবং দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতাকে ধরে রাখার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
কাওয়ালিতে নিজস্ব পরিচয়
দক্ষিণ এশিয়ার সুফি সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা কাওয়ালি। এই সংগীতে আধ্যাত্মিক কবিতা, পুনরাবৃত্তিমূলক পঙ্ক্তি, তবলা বা অন্যান্য তালবাদ্য, হারমোনিয়াম এবং সমবেত কণ্ঠের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশনার সঙ্গে সঙ্গে গানের গতি ও তীব্রতা বাড়তে থাকে। প্রধান শিল্পীর কণ্ঠের সঙ্গে দলের অন্য সদস্যদের সাড়া তৈরি করে এক ধরনের সম্মিলিত আবহ।
নুসরাত ফাতেহ আলি খান এই ঐতিহ্যকে ধারণ করেই নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। তার গানের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল স্বরের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। কখনো কোমল ও ধীর সুরে শুরু করে মুহূর্তেই কণ্ঠের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতেন। আবার একই পঙ্ক্তি নানা ভঙ্গিতে গেয়ে তৈরি করতেন নতুন আবেগের স্তর।
‘আল্লাহ হু’, ‘দম মস্ত কালান্দার’ এবং ‘হক আলী আলী’র মতো কাওয়ালি তার পরিবেশনায় ব্যাপক পরিচিতি পায়। তার গাওয়া সুফি সংগীতের পাশাপাশি গজল ও অন্যান্য ধারার গানও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়।
তবে তার সাফল্যের কারণ শুধু কণ্ঠের কারুকাজ ছিল না। দীর্ঘ পরিবেশনার মধ্যেও শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল তার অন্যতম শক্তি। ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও তার গানের আবেগ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে।
পশ্চিমা সংগীতের সঙ্গে নতুন পরিচয়
নুসরাতের সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রবেশ। ১৯৮৫ সালে যুক্তরাজ্যের ওম্যাড উৎসবে তার পরিবেশনা পশ্চিমা শ্রোতাদের মধ্যে কাওয়ালিকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে। সংগীতশিল্পী পিটার গ্যাব্রিয়েলের প্রতিষ্ঠিত রিয়েল ওয়াল্ড রেকর্ড-এর সঙ্গেও পরবর্তী সময়ে যুক্ত হন তিনি।
এই সংযোগ তার সংগীতজীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। পশ্চিমা সংগীতের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে কাওয়ালির মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি এমন কিছু কাজ করেন, যা ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালির পরিচিত দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছায়।
১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘মাস্ত মাস্ত’ অ্যালবামটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কানাডীয় সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক মাইকেল ব্রুকের সঙ্গে তার কাজটি কাওয়ালির সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও সংগীত বিন্যাসের সংযোগ ঘটায়। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘নাইট সং’ অ্যালবামেও এই সহযোগিতার ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
তবে নতুন ধারার সংগীত নিয়ে তার এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা ছিল না। বরং কাওয়ালির মূল সুর ও আবেগকে ধরে রেখে সেটিকে ভিন্ন সংগীতভাষায় উপস্থাপনের প্রয়াস ছিল।
পিটার গ্যাব্রিয়েল ছাড়াও মাইকেল ব্রুক ও পার্ল জ্যামের এডি ভেডারের মতো আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে তার কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এসব সহযোগিতা নুসরাতের সংগীতকে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও পরিচিত করে তোলে।
চলচ্চিত্রেও কণ্ঠের উপস্থিতি
নুসরাত ফাতেহ আলি খানের কণ্ঠের ব্যবহার শুধু অ্যালবাম বা মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের সংগীতেও তার পরিবেশনা জায়গা করে নেয়। মার্টিন স্করসেসির ‘দ্যা লাস্ট টেম্পটেশন অফ ক্রিস্ট’ চলচ্চিত্রের সংগীতে তার কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ‘ন্যাচারাল বর্ন কিলার্স’ এবং ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’-এর মতো চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাকেও তার সংগীতের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠের বিশেষত্ব ছিল আবহ তৈরির ক্ষমতা। প্রচলিত অর্থে গান না হলেও তার কণ্ঠের বিভিন্ন স্বর ও সংগীতের বিস্তার দৃশ্যের আবেগকে আরও গভীর করে তুলতে পারত। এভাবেই তিনি এমন এক শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে যান, যারা হয়তো আগে কখনও কাওয়ালি শোনেননি।
অকালমৃত্যু, অমলিন উত্তরাধিকার
১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান নুসরাত ফাতেহ আলি খান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কাওয়ালির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তবে তার সংগীতের যাত্রা থেমে থাকেনি।
তার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কাজেও দেখা যায়। বিশেষ করে ভাতিজা রাহাত ফাতেহ আলি খান পারিবারিক সংগীতের ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনেও পরিচিতি পেয়েছেন। নুসরাতের গাওয়া গান নতুন করে পরিবেশিত হয়েছে, বিভিন্ন সংগীত আয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘চেইন অব লাইট’ অ্যালবামটিও তার সংগীতের উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করে। অ্যালবামটির গানগুলো ১৯৯০ সালে রেকর্ড করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকার পর সেগুলো পুনরুদ্ধার ও নতুনভাবে প্রকাশ করা হয়। অ্যালবামটি প্রমাণ করে, কয়েক দশক আগে ধারণ করা তার পরিবেশনাও আজকের শ্রোতার কাছে সমান আবেদন তৈরি করতে পারে।
যে কণ্ঠের আবেদন ফুরায় না
নুসরাত ফাতেহ আলি খানের সংগীতকে শুধু কাওয়ালির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তার অবদানের পুরোটা বোঝা যায় না। তিনি দেখিয়েছেন, একটি আঞ্চলিক সংগীতধারা নিজের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখেও কীভাবে আন্তর্জাতিক শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারে। তাঁর কণ্ঠে সুফি কবিতার আধ্যাত্মিকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সংগীতের সীমানা অতিক্রম করার স্বাধীনতা।
তার গান শুনতে গিয়ে শ্রোতা কখনও প্রার্থনার আবহ খুঁজে পান, কখনও খুঁজে পান গভীর ব্যক্তিগত আবেগ। আবার কখনো কেবল কণ্ঠের অসাধারণ বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে থাকেন। এই বহুমাত্রিক আবেদনই তাকে সময়ের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া শিল্পীদের কাতারে নিয়ে গেছে।