logo
Advertisement

একটি কণ্ঠ, কয়েক প্রজন্মের বাংলাদেশ

একটি কণ্ঠ, কয়েক প্রজন্মের বাংলাদেশ
ছবি: সাবিনা ইয়াসমীন

কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না—একটি সময়কে ধরে রাখে। একটি প্রজন্মের শৈশব, আরেক প্রজন্মের প্রেম, কোনো এক দুপুরের বিষণ্নতা, স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস কিংবা হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি সবকিছু কখনো কখনো আশ্রয় নেয় একটি কণ্ঠে। বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ তেমনই এক দীর্ঘ আশ্রয়ের নাম।

Advertisement

আজ ৪ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের সংগীতের কিংবদন্তি এই শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৫৪ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্ম নেওয়া সাবিনা ইয়াসমীন পেরিয়ে এসেছেন জীবনের সাত দশকেরও বেশি সময়। গানকে সঙ্গী করে তার পথচলা পাঁচ দশকেরও বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু অসংখ্য গান গেয়েছেন তা নয়, তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে মিশে গেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে।

একজন শিল্পীর জনপ্রিয়তা হয়তো সময়ের সঙ্গে বদলায়। কিন্তু কিছু কণ্ঠ সময়ের বদলকে অতিক্রম করে। সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ সেই বিরল ব্যতিক্রমগুলোর একটি।

সাত বছরের মেয়েটি এবং মঞ্চের প্রথম আলো

সাবিনা ইয়াসমীনের সংগীতযাত্রা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। জন্মেছিলেন এমন একটি পরিবারে, যেখানে গান ছিল জীবনেরই অংশ। তার বাবা লুৎফর রহমান ছিলেন তৎকালীন প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা, মা বেগম মওলুদা খাতুন। পাঁচ বোনের পরিবারে সংগীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল একাধিক বোনেরই।

মাত্র সাত বছর বয়সে মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ আসে তার। শিশুকণ্ঠে গান—তারপর ধীরে ধীরে রেডিও, সংগীতচর্চা, চলচ্চিত্র এবং একসময় বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হয়ে ওঠা। শৈশবেই তার সংগীতশিক্ষার শুরু। শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পি. সি. গোমেজের কাছে। ফলে তার কণ্ঠে শুধু স্বাভাবিক মাধুর্য নয়, তৈরি হয়েছিল তাল, সুর ও উচ্চারণের একটি শক্ত ভিত।

১৯৬০-এর দশকের শুরুতেই শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেন তিনি। ১৯৬২ সালের নতুন সুর চলচ্চিত্রে শিশুকণ্ঠে গান গাওয়ার পর তার সামনে খুলতে থাকে নতুন দরজা। তবে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তার প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে আগুন নিয়ে খেলা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদের সুরে ‘মধুর জোছনা দীপালি’ গানটি হয়ে ওঠে সেই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তখন তিনি জানতেন না, এই একটি গান তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। আর হয়তো জানতেন না, তার কণ্ঠ একদিন হয়ে উঠবে কয়েক দশকের চলচ্চিত্রের আবেগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ভাষা।

গান যখন হয়ে ওঠে সময়ের দলিল

সাবিনা ইয়াসমীনের ক্যারিয়ারকে কেবল ‘প্লেব্যাক’ শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ তিনি গেয়েছেন প্রেমের গান, বিরহের গান, লোকগান, আধুনিক গান, দেশাত্মবোধক গান—অসংখ্য ধারার সংগীত। তার কণ্ঠে কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতি, কখনো সামষ্টিক আবেগ, কখনো একটি দেশের ইতিহাস কথা বলেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী সময়ে দেশাত্মবোধক গান তার শিল্পীসত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’সহ তাঁর গাওয়া বহু গান মানুষের মধ্যে দেশ ও স্বাধীনতার অনুভূতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

দেশাত্মবোধক গান তার কাছে কেবল একটি সংগীতধারা ছিল না। বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, আত্মপরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে এসব গান এমনভাবে মিশে গেছে যে অনেক সময় গানের শিল্পীর নাম আলাদা করে মনে না রেখেও মানুষ গানের সঙ্গে নিজের ইতিহাসকে চিনে নেয়। এখানেই সাবিনা ইয়াসমীনের বিশেষত্ব। তিনি শুধু গানকে জনপ্রিয় করেননি; অনেক গান তাঁর কণ্ঠে এসে পেয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জীবন।

রূপালি পর্দার অদৃশ্য চরিত্র

চলচ্চিত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দেখা যায়। তাদের মুখ, পোশাক, অভিনয়—সবকিছু পর্দায় দৃশ্যমান। কিন্তু প্লেব্যাক শিল্পী থেকে যান আড়ালে। দর্শক পর্দায় অন্য একজনকে দেখেন, অথচ সেই চরিত্রের আবেগ অনেক সময় পৌঁছে যায় শিল্পীর কণ্ঠের মাধ্যমে। সাবিনা ইয়াসমীন সেই অদৃশ্য চরিত্রটির অন্যতম শক্তিশালী শিল্পী।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কয়েক দশকের ইতিহাস খুললে তার গাওয়া গান বারবার ফিরে আসে। সুজন সখী, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, চন্দ্রনাথ, প্রেমিক, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, দুই জীবন, দাঙ্গা, রাধাকৃষ্ণ, আজ গায়ে হলুদ, দুই নয়নের আলো, দেবদাস ও পুত্র—এমন অসংখ্য চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। আর এখানেই আসে একটি বিস্ময়কর পরিসংখ্যান।

সাবিনা ইয়াসমীন গেয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি গান, যার মধ্যে ১ হাজার ৫০০-এর বেশি চলচ্চিত্রের গান। এই সংখ্যা শুধু একজন শিল্পীর কাজের পরিমাণ বোঝায় না, এটি বাংলাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্রের একটি দীর্ঘ সময়ের মানচিত্রও তৈরি করে। একটি কণ্ঠ কত মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে—এই সংখ্যার চেয়েও বড় উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে মানুষের স্মৃতিতে।

কোনো পুরোনো চলচ্চিত্রের গান হঠাৎ কোথাও বাজলে মানুষ থেমে যায়। কোনো পুরোনো প্রেমের স্মৃতি ফিরে আসে। কোনো জাতীয় দিবসে তার কণ্ঠে দেশাত্মবোধক গান শুনলে অন্যরকম আবেগ তৈরি হয়। অর্থাৎ তার গান কেবল শোনা হয় না। অনেক সময় গান হয়ে ওঠে স্মৃতি মনে করার একটি মাধ্যম।

পুরস্কারের সংখ্যার চেয়েও বড় স্বীকৃতি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ইতিহাসেও সাবিনা ইয়াসমীনের অবস্থান অনন্য। চলচ্চিত্রের গানে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন ১৪টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী বিভাগে, যা এই বিভাগে রেকর্ডসংখ্যক। প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আসে ১৯৭৫ সালে সুজন সখী চলচ্চিত্রের জন্য।

এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠ স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় তার নাম বারবার ফিরে আসা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতে তার প্রভাবেরই সাক্ষ্য। সংগীতে সামগ্রিক অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে তিনি পেয়েছেন একুশে পদক। ১৯৯৬ সালে পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার। এ ছাড়া সংগীতজীবনে পেয়েছেন আরও বহু সম্মাননা। ১৯৮৫ সালে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতেও ভূষিত হন তিনি।

তবে একজন শিল্পীর জীবনকে শুধু পুরস্কারের তালিকা দিয়ে মাপা যায় না। পুরস্কার একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা একটি গান—সেটি অন্য ধরনের স্বীকৃতি। সাবিনা ইয়াসমীনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত সেখানেই।

খ্যাতির বাইরে একজন নিরন্তর শিক্ষার্থী

দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরও সাবিনা ইয়াসমীনের নিজের কথা শুনলে পাওয়া যায় অন্যরকম এক বিনয়। তার কাছে গান এখনো শেখার বিষয়। নিয়মিত রিয়াজ তার জীবনের অংশ। এটি হয়তো তাঁর দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠের রহস্যের একটি বড় দিক।

শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর অনেকেই অর্জনকে চূড়ান্ত মনে করতে পারেন। সাবিনা ইয়াসমীনের ক্ষেত্রে সংগীত যেন বরং আজীবনের অনুশীলন। তার নিজের ভাষায়, জীবনও এক ধরনের ধারাবাহিক শিক্ষা। এই মানসিকতাই হয়তো তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ রাখতে সাহায্য করেছে।

কারণ সময় বদলেছে। গানের প্রযুক্তি বদলেছে। শ্রোতার রুচি বদলেছে। চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে। ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে ইউটিউব—সংগীত শোনার মাধ্যমও বদলে গেছে বহুবার। কিন্তু সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ হারিয়ে যায়নি।

জন্মদিনে ফিরে দেখা

জন্মদিন মানেই শিল্পীর জন্য বড় আয়োজন—এমন নয়। বরং জীবনের এই পর্যায়ে এসে সাবিনা ইয়াসমীনের কাছে জন্মদিনের অর্থ অনেক বেশি ব্যক্তিগত। পরিবারের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো, গানকে ঘিরে থাকা—এই সরলতাই যেন তাঁর পছন্দ।

তাঁর জীবনে ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনারও কম গল্প নেই। সংগীতের দীর্ঘ পথচলায় বহু প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে কিংবদন্তি গীতিকার ও চলচ্চিত্রকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের মৃত্যু তাঁর জীবনে তৈরি করে গভীর শূন্যতা। ফলে জন্মদিনের উদযাপনও তাঁর কাছে এখন আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তবু গান থেমে নেই।

সম্প্রতি নতুন গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও সংগীতস্রষ্টাদের সঙ্গে কাজ করছেন। আবার দেশের বাইরে গিয়েও গান শোনাচ্ছেন প্রবাসী বাঙালিদের। অর্থাৎ বয়স তাঁর কণ্ঠের পথ থামাতে পারেনি।

একটি কণ্ঠের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের আয়না

সাবিনা ইয়াসমীনকে নিয়ে লিখতে গেলে সবচেয়ে সহজ হয় তাঁকে ‘গানের সম্রাজ্ঞী’, ‘প্লেব্যাক সম্রাজ্ঞী’ কিংবা ‘কোকিলকণ্ঠী’ বলে থেমে যাওয়া। কিন্তু তার গুরুত্ব তার চেয়ে অনেক গভীর।

কারণ তিনি এমন এক সময় গান শুরু করেছিলেন, যখন বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছিল। তারপর তিনি দেখেছেন স্বাধীনতা, দেখেছেন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন, চলচ্চিত্রের বিবর্তন, সংগীতের প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং নতুন প্রজন্মের আগমন। এই দীর্ঘ সময়ের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠও বদলেছে, কিন্তু হারায়নি তার নিজস্বতা।

একজন শিল্পী যখন পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের সঙ্গে থাকেন, তখন তাঁর গান আর কেবল তাঁর থাকে না। তা হয়ে যায় মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ। কারও কাছে একটি গান মানে শৈশব। কারও কাছে প্রেম। কারও কাছে মা-বাবার স্মৃতি। কারও কাছে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর গল্প। কারও কাছে পুরোনো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র।

সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ তাই এক অর্থে বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিরই আরেক নাম। আজ তার জন্মদিনে তাকে নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন একটু থেমে ফিরে শোনা—কতগুলো দশক পেরিয়ে একটি কণ্ঠ কীভাবে আমাদের জীবনের ভেতর ঢুকে গেছে। হয়তো তখন বোঝা যাবে, কিছু শিল্পীর বয়স ক্যালেন্ডারে বাড়ে, তাদের কণ্ঠের বয়স বাড়ে না। সাবিনা ইয়াসমীন সেই বিরল শিল্পী—যার গান শেষ হয়ে গেলেও স্মৃতি শেষ হয় না। আর সেই কারণেই, বাংলাদেশের সংগীতের দীর্ঘ ইতিহাসে তার নাম শুধু একটি অধ্যায়ের নয়—একটি দীর্ঘ সময়ের স্বরলিপি।